[X]

ভারতের স্যানিটেশন সমস্যা, বলিউডের সিনেমায়ঃ ‘টয়লেট: এক প্রেম কথা’

আমাদের এই ‘অ্যাটাচড টয়লেট’ অভ্যস্ত জীবনে বিষয়টি যতই অদ্ভুত এবং আজব হোক না কেন, এমনটা আজও হয়। বাড়ির উঠোনে তুলসীমঞ্চ থাকার কারণে চৌহদ্দির মধ্যে ঠাঁই পায় না শৌচালয়। পুরুষদের গতিবিধি বাড়ি-লাগোয়া নর্দমায় এবং পেছন দিকের ঝোপে।

আর মহিলাদের ভোরের আলো ফোটার আগে, নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে, দূরের কোনও খেতে গিয়ে, পাড়ার মেয়ে-বৌরা মিলে দলবেঁধে প্রাতঃকৃত্য সেরে আসার চলতি নামই লোটা-পার্টি ।বিয়ের পরে এ হেন চিরাচরিত অভ্যেসের মধ্যে এসে পড়ে, যুক্তিবাদী জয়া রাজি হলেন না পাড়ার লোটা-পার্টিতে নাম লেখাতে।

‘পড়ি-লিখি’ জয়া ফুলশয্যার রাতের পরেই সাফ জানিয়ে দিলেন, বেআব্রু জায়গায় শরীরের আব্রু সরিয়ে সব চেয়ে প্রয়োজনীয় কাজটুকু সারতে তিনি রাজি নন।প্রতিবাদের প্রথম চারাগাছটা নিজের বাড়িতেই পুঁতলেন, কেশবকে ভালবেসে বিয়ে করে উত্তরপ্রদেশের মন্দগাঁওয়ে আসা জয়া। বলেই দিলেন, ঘরে শৌচালয় তৈরি না হলে, তিনিও থাকবেন না শ্বশুরবাড়িতে।

জয়ার প্রতিবাদ আর সেই প্রতিবাদের সমর্থনে কেশবের লড়াই ঘিরে, গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে স্যানিটেশন দফতর, সরকারের ভূমিকা থেকে গ্রামবাসীদের কুসংস্কার এবং প্রথম প্রেম থেকে পরিপক্ক রোম্যান্স নিয়েই পরিচালক নারায়ণ সিংহের ছবি, ‘টয়লেট: এক প্রেম কথা’। বলাই বাহুল্য, বিষয়গত ভাবেই আর পাঁচটা বিনোদনমূলক ছবির চেয়ে অনেকটা বেশি এগিয়ে রয়েছে এই ছবি।

তবে প্রাথমিক ভাবে আপত্তি জানালেও, জয়া এক সময় মেনে নেন, কেশবের ঠিক করে দেওয়া ট্রেন-শৌচাগারের ব্যবস্থা। সকালবেলা মন্দগাঁও স্টেশনে সাত মিনিটের জন্য দাঁড়ানো ট্রেনটিতে উঠে রোজের প্রাতঃকৃত্য সেরে নিতে রাজি হয়ে যান। প্রশ্ন ওঠে, কী হত, যদি এক দিন ট্রেনটা ছেড়ে না দিত? তবে প্রশ্ন স্থায়ী হয় না, কারণ এটা সিনেমা। বাস্তব নয়।

জয়ার প্রতিবাদী সত্ত্বাকে দিয়ে বিয়ে ভাঙার চরমতম পদক্ষেপটা করিয়ে নিতে, জয়া ট্রেন থেকে নামার আগেই প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেন ছাড়িয়ে দেন পরিচালক। কেশবকেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করান, স্ত্রীকে সসম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য বাড়িতে শৌচালয় গড়তে।

বস্তুত, তুলসীমঞ্চ থাকায় বাড়ির চৌহদ্দিতে শৌচালয় তৈরি না হওয়ার যে যুক্তি, সে যুক্তি যে বাড়ির মহিলাদের ইজ্জতকে প্রতি দিন আহত করছে, সে বোধ এখনও আসেনি বিহার-ঝাড়খণ্ড-উত্তরপ্রদেশের বহু গ্রামের ঘরে ঘরে। বছরের পর বছর এ ভাবেই চলে।

জয়া এসে যখন পাল্টা যুক্তিতে ঘর ছাড়েন, যখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, ঝুটো সংস্কারের চেয়ে নারীর সম্মান অনেক বড়, তখন আর চাপা থাকে না শত শত মহিলার ক্ষোভ, রাগ, অপমান। গর্জে ওঠে প্রতিবাদ। প্রতিবাদের প্রতীক স্বরূপ ঘরের সিঁড়ি বেয়ে শব্দ করে গড়িয়ে পড়ে ঘটি।

তার পর সিনেমাসুলভ ভাবেই শেষ হয় গল্প। নড়ে বসে সরকার, অচলায়তনের পর্দা সরে কেশবের গোঁড়া বাবুজির চোখ থেকে। জোর করে যে শৌচালয় কেশব বানিয়েছিলেন, তাকে ভেঙে দিয়েও, সেই শৌচালয়ই ব্যবহার করতে বাধ্য হন বাবুজির ততোধিক গোঁড়া মা।

কেশবের ভূমিকায় অক্ষয়কুমার যথাযথ। নজর কাড়েন জয়ার ভূমিকায় ভূমি পেডনেকর। অক্ষয়কুমারের সিনেমা, মারামারি থাকবে না, তা তো হয় না। ফলে শেষবেলায় এসে পূরণ হয় তা-ও।অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক সমস্যা সিনেমায় বুনতে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক।

দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে রাখা জগদ্দল ভাবনার পাথর সরিয়ে যুক্তির আলো দেখাতেও সক্ষম তিনি। ঘরে ঘরে শৌচালয় না থাকায় সরকারের অবহেলা যতটা, তার চেয়েও বেশি অনীহা যে বাসিন্দাদেরই, এ সত্য প্রকাশ করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

আবার একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন, গ্রামবাসীদের এই অনীহাকে অস্ত্র করেই কী ভাবে জাল বুনেছে সরকারি দুর্নীতি।