জেনে নিন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশটি কেমন!

দক্ষিন চীন সাগরের দণি প্রান্তে মালয়েশিয়ার পেটে ছোট একটি দেশ ব্রনেই। পশ্চিম আর উত্তরে সাগরের দিগন্ত বিস্তারি জলরাশি। দক্ষিন দিকটায় মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া। পূর্বে বেশ খানিকটা দূরে ফিলিপিন। উত্তর দিকে সাগরপথে হাজার মাইল পাড়ি দিলে পড়বে ইন্দোচীন।

মালয়েশিয়ার সাবাহ, সারাওয়াক আর ফিলিপিনের মুসলিম প্রদেশটিতে মূলত এদের শিকড়। হাজার বছরের ঐতিহ্য আবর্তিত হয়েছে মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে। দেশটি মূলত একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র। তাদের দেশ পরিচালনার মূলমন্ত্র পবিত্র কুরআন। যদিও সুলতানের রয়েছে একচেটিয়া আধিপত্য। চৌদ্দ শতকে ছোট দেশটিতে একটি শক্তিশালী সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সুলতান হাসান আল বলকিয়াহ তারই নিরবচ্ছিন্ন ২৯তম উত্তরাধিকার।

সুলতান হাজি ওমর আলি সাইফুদ্দিন স্বেচ্ছায় অবসরে যান ১৯৬১ সালে। বড় সন্তান হিসেবে সালতানাতের দায়িত্ব্ পান ক্রাউন প্রিন্স হাসান আল বলকিয়াহ। ইসলামি ভাবধারা আর মূল্যবোধের অনুসরণে পরিচালিত ব্রনেই। তবে রাজকীয় অনুষ্ঠানে আড়ম্বরের অভাব হয় না। হাসানের রাজকীয় অভিষেক হয় ১৯৬৮ সালের ১ আগস্ট। ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণকারী সুলতানের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ। ব্রিটেনের মিলিটারি একাডেমিতে অ্যাডমিশনের সুযোগ পান। ক্যাপটেন হিসেবে তিনি কমিশন পান সেখানে। পাশাপাশি তিনি মালয়েশিয়া থেকে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজমুকুট গ্রহণ করার পর একই সাথে তিনি প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, ব্রনেই দারুসসালামের ধর্মীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমান রাজা হাসানের পিতা সাইফুদ্দিনকে আধুনিক ব্রনেইয়ের রূপকার বলা হয়। হাসান আল বলকিয়াহের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রিন্স হাজি আল-মুহতাদি বিল্লাহ। তিনি ক্রাউন প্রিন্স। ইতোমধ্যেই ঘোষণা হয়ে গেছে তিনি ব্রুনেই সালতানাতের ৩০তম উত্তরাধিকার। তার জন্ম ১৯৭৪ সালে ১৭ ফেব্র“য়ারি। তাকে রাজপদ নেয়ার জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি কুরআনে হাফেজ। ইসলামের মৌল বিষয়ে তাকে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হচ্ছে। শরিয়ত সম্পর্কে জ্ঞানার্জন দেশটিতে বাধ্যতামূলক। ক্রাউন প্রিন্সকে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মূলত সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জনের জন্য এ ব্যবস্থা।

চৌদ্দ থেকে ষোড়শ শতকে ব্রনেইতে শক্তিশালী মুসলিম সালাতানাত গড়ে ওঠে। মালয় অংশের সাবাহ, সারাওয়াক ও ফিলিপিনের ভাটি অঞ্চল নিয়ে তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়। বর্তমান সালতানাত বিশ্বের পুরাতন সালতানাতগুলোর একটি। উনিশ শতকে ব্র“নেই সালতানাত যুদ্ধ, হাঙ্গামা আর ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের মুখে মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়।

একনজরে ব্রুনেই

দেশের নাম
সালতানাত অব ব্রুনেই

জনসংখ্যা
৩ লাখ ৭৪ হাজার

রাজধানী
বন্দর সেরি বেগওয়ান

আয়তন
৫ হাজার ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার

প্রধান ভাষা
মালয়, ইংরেজি, চীনা

ধর্ম
ইসলাম

গড় আয়ু
৭৪ (পুরুষ), ৭৯ (মহিলা)

মুদ্রা
ব্রুনেই ডলার

প্রধান রফতানি পণ্য
অপরিশোধিত তেল, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রলিয়াম জাতীয় পদার্থ

১৮৪৭ সালে সুলতান ব্রিটেনের সাথে একটি চুক্তি স্বার করে। ১৮৮৮ সালে এটি ব্রিটিশ করদ রাজ্যে পরিণত হয়। নিযুক্ত হয় ব্রিটিশ শাসক। তিনি সুলতানের উপদেষ্টা নিযুক্ত হলেও মতার চাবিকাঠি তার হাতেই চলে যায়। সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিষয় ছাড়া রাষ্ট্রের সব বিষয় ব্রিটিশ নিযুক্ত উপদেষ্টা সর্বময় মতার চর্চা করতেন। ১৯৫৯ সালে একটি সংবিধান রচিত হয়। এর আওতায় ব্রনেইকে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনের নামে কিছু মতা দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে সুলতানকে পুরো স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়।

তবে প্রতিরা এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক যাবতীয় বিষয়ে মতা ব্রিটিশদের হাতে থেকে যায়। ১৯৮৪ সালে ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় জীবনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন। তারা এদিন পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। সুলতান হাসান আল বলকিয়াহ প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ছয় সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা গঠন করে রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ শাসক হন। এরপর মন্ত্রিসভাকে ১১ সদস্যে উন্নীত করা হয়। দায়িত্ব ভাগাভাগি করে দেয়া হয়। সুলতানের আরো কিছু সহযোগী নিয়োগ দেয়া হয়।

ছোট এ মুসলিম দেশটি অর্থসম্পদে সমৃদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা দেশটিতে অপার প্রাকৃতিক সম্পদ দেন। জনসাধারণের সার্বিক জীবনমানের উন্নয়নে একের পর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এসব পরিকল্পনার আওতায় এগুলোর সদ্ব্যবহার শুরু হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হয়। তেলসম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও অর্থনৈতিক বহুমুখিতার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। তারা সফল হয়। দেশে নানান শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

সরকার এ জন্য ৭ হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ করে। এর মধ্যে সামাজিক সেবা খাত ২ হাজার কোটি ডলার, পাবলিক ইউটিলিটি দেড় হাজার কোটি ডলার, সড়ক যোগাযোগ দেড় হাজার কোটি ডলার, শিল্প ও ব্যবসায় ১ হাজার কোটি ডলার, সরকারি উদ্যোগে আবাসিক এলাকা নির্মাণে সাড়ে ৬০০ কোটি ডলার ও নিরাপত্তায় সাড়ে ৫০০ কোটি ডলার। এ বাজেট দেশে মনে হতে পারে এটি ১০ কোটি জনসংখ্যার বিশাল দেশ। এগুলো আসলে সুলতানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল।

দেশে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বন্দর সেরি বেগওয়ান বিশ্বেও অন্যতম বিমানবন্দর। চার হাজার মিটারের রানওয়ে। যেকোনো ধরনের এয়ারক্রাফট এখানে ল্যান্ড করতে পারে। বছরে ১৫ লাখ মানুষ গমনাগমনের সুবিধা এবং ৫০ হাজার টন মাল বহন করার সুযোগ রয়েছে এ বিমানবন্দরে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণসহ এর সার্বিক ব্যবস্থাপনা সর্বাধুনিক যা মাত্র চার লাখ মানুষের দেশে কল্পনা করা যায় না। ১৯৭৪ সালে ব্রুনেই রয়াল এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বর্তমানে বিশ্বের একটি নামকরা বিমান সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

দেশে আরো একটি বিমানবন্দর রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য হ্যালিপ্যাড সুবিধা। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর মুয়ারা। এর অবকাঠামো ব্যবস্থাও সর্বাধুনিক। এ ছাড়া আরো দু’টি সমুদ্রবন্দর রয়েছে। ব্রনেইতে সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। এ সময় মাথায় রাখা হয় মানুষের বসবাস এলাকা, ব্যবসায়িক কেন্দ্র ও শিল্প এলাকা। প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে হাইওয়ে, লিঙ্ক রোড ও ফাইওভার। দেশে আড়াই হাজার কিলোমিটারের উন্নত পাকা সড়ক। এতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের পাথর, বালি ও কেমিক্যাল।
শিক্ষাব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। সরকার মানসম্পন্ন শিক্ষায় বেশ মনোযোগী।

১৪৭টি সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রয়েছে ৬০টি বেসরকারি স্কুল। নিচের পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচি রয়েছে। যারা ছাত্রাবাসে থাকবে না তাদের জন্য ফ্রি যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চশিার জন্য রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ব্রনেই দারুসসালালাম। সরকার ব্যাপক হারে স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছে। যেসব বিষয়ে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ নেই সেসব বিষয়ে ছাত্রদের স্কলারশিপ দিয়ে বাইরে পাঠানো হয়। সরকার জনগণের জন্য বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা দেয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে সড়ক বা নৌ যোগাযোগ নেই সেখানে বিমানে করে সরকার জনগণকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। প্রত্যেকটি জেলায় চারটি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তার ওপর দু’টি করে বেসরকারি হাসপাতালও রয়েছে। ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি রাজধানীতে অবস্থিত। এখানে সর্বাধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

জনগণের আবাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগ রয়েছে ব্রনেইতে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় এটি সরকারের কার্যসূচির অন্তর্ভূক্ত হয়। জনগণকে স্বাস্থ্যকর আরামদায়ক আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য এটি সরকারের একটি অব্যাহত পরিকল্পনা। ভূমিহীন থেকে শুরু করে সর্বসাধারণের জন্য সরকার পর্যায়ক্রমে এই আবাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এতে করে পুরো দেশটি একটি সুপরিকল্পিত বসবাস এলাকায় পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে। এক পর্যায়ে দেশের প্রত্যেকটি মানুষ এর আওতায় চলে আসবে।

এখানে নিরীয় জলবায়ু। আবহাওয়া উষ্ণভাবাপন্ন। বাতাসে বেশি মাত্রায় জলীয় দ্রবণ। তাই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি। তাপমাত্রা ২৩ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জায়গাভেদে ২৫০০ মিলিমিটার থেকে ৭৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। বিশেষ করে উপকূলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ সবসময় বেশি থাকে বলে ঋতু পরিবর্তন বোঝার উপায় নেই এ দেশে। সবসময় দেশে একই ধরনের আবহাওয়া লক্ষণীয়।

দেশটি চারটি জেলায় বিভক্ত। এগুলো ব্রনেই মুয়ারা, টুটঙ্গ, বেলায়েত এবং টেমবুরাঙ্গ। রাজধানী বন্দর সেরি বেগওয়ান। এর বিস্তৃতি ১৬ বর্গমিটার। অন্য উল্লেখযোগ্য শহর হচ্ছে মুয়ারা। এটি প্রধান সমুদ্রবন্দর।

২০০৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এ দেশের জনসংখ্যা ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০। এর মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার ২০০ পুরুষ ও ১ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ মহিলা। জনসংখ্যার ৪১ শতাংশের বয়স ১৯ বছরের নিচে। ১৯ থেকে ৬৪ বছরের জনসংখ্যা ৫৬ শতাংশের ওপরে। দেশের প্রধান জনগোষ্ঠী হলো মালয়, কেদায়ান, টুটঙ্গ, বেলায়েত, বিসায়া, দুসুন ও মুরুত। মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশের বেশি এসব জাতিগোষ্ঠীর। চীনাদের সংখ্যা ১১ শতাংশের বেশি।

সূত্র: অন্য দিগন্ত