বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তি, চলছে মেসি বন্দনা

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় টান টান উত্তেজনা। এই আর্জেন্টাইন ভক্তরা আর্জেন্টিনার একটি জাতীয় পতাকা হাতে পোজ দিচ্ছেন। ছবিটি ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে তোলা।

বাংলাদেশ সময় বুধবার (১১ অক্টোব) ভোরে আর্জেন্টিনা-একুয়েডরের মধ্যেকার ফুটবল ম্যাচটি শুরু হবো হবো করছে, তখন ফেসবুকে এক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী লিখলেন, “যারা খেলা দেখবেন, তারা দোয়া করবেন আর্জেন্টিনার জন্য। এই আমার অনুরোধ”।

এই কথা কটির নানা রকম অর্থ করে নিতে পারেন অনেকে, কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য ভক্তদের দোয়া ভক্তদের স্বার্থেই প্রয়োজন ছিল। আজকের ম্যাচে একুয়েডরের কাছে হারলে, আর্জেন্টিনার সরাসরি বিশ্বকাপে যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে যেত। বিশ্বকাপে খেলার জন্য দলটিকে পড়তে হতো অনেক জটিল হিসেব নিকেশের মুখে।

ফলে এটা ছিল আর্জেন্টিনার জন্য ‘মাস্ট উইন’ ম্যাচ।  অবশ্য সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়েছেন আর্জেন্টিনার এবং সারা বিশ্বের সেরা ফুটবল তারকাদের একজন লিওনেল মেসি। তার করা এক হ্যাটট্রিকে আর্জেন্টিনা ১৯৭০ সালের পর এই প্রথম একটি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া এড়ালো।

আর আর্জেন্টিনা যদি হেরে যেত! তাহলে আগামী বছর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বের কাছে তো বটেই, বাংলাদেশের লাখ লাখ ফুটবল ভক্তের কাছেও রং হারিয়ে ফেলতে নিশ্চিতভাবে। এই ফেসবুক ব্যবহারকারীর কথায় সেটা স্পষ্ট যিনি ম্যাচ শুরুর আগে লিখেছেন, “লিওনেল মেসি ছাড়া ওয়ার্ল্ড কাপ জমবে না। আর আর্জেন্টিনা যদি ওয়ার্ল্ড কাপ রাশিয়া ২০১৮ না খেলে তাহলে ক্রাই বেবিদের চোখের জলে দুনিয়াব্যাপী বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই আসুন, বৃহত্তর স্বার্থে আমরা আর্জেন্টিনার কোয়ালিফাইয়িং এর জন্য দোয়া করি”। স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন স্পেন ও রেয়াল মাদ্রিদের সমর্থক বলে।

বাংলাদেশের ফুটবলে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা রেশারেশি কয়েক দশকের পুরনো। ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার ও আর্জেন্টাইন তারকা মেসির শার্ট পড়া দুই বন্ধুর এই ছবিটি ২০১৪ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে তোলা।

কে না জানে, ফুটবল প্রসঙ্গ এলে সারা বাংলাদেশ কিভাবে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা হয়ে যায়।
তাই ব্রাজিল সমর্থকদেরও বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা ধরে রাখবার জন্য প্রয়োজন আর্জেন্টিনাকে।
উজ্জ্বল দাস নামের একজন ব্রাজিলের সমর্থক ফেসবুকে লিখেছেন, “ব্রাজিলের সাপোর্টার হয়ে চাই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলুক। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা ছাড়া বিশ্বকাপ মাছ ছাড়া পানির মত”।
আর শেখ খলিল সোহেল লিখেছেন, “আমি চাই আজ আর্জেন্টিনা জিতুক। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা তর্কাতর্কিটা বিশ্বকাপে থাকুক। খেলা নিয়ে তর্কাতর্কি না হলে খেলার মজা থাকেনা”!

ব্রাজিল আর্জেন্টিনা এই তর্কাতর্কিটা বরাবরের মতোই গত কয়েকদিন ধরেও চলছে। যদিও, আর্জেন্টিনা বনাম একুয়েডরের এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য ছিল বাঁচা-মরার, ব্রাজিলের জন্য পাওয়ার বা হারানোর কিছুই নয়।
কিন্তু তারপরও ব্রাজিলের সমর্থকেরা আগুনে ঘি দিয়েই গেছেন অনবরত।
যেমন, আর্জেন্টিনা একুয়েডরকে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর সাব্বির ইবনে মোস্তফা ফেসবুকে লিখেছেন, “এরা কারা, যারা বিশ্বকাপে উইঠাই স্বপ্ন দেখতেছে বিশ্ব কাপ নিয়া নিছে”?

মমিনুর রহমান লিখেছেন, “জিতেছে প্লে অফ ম্যাচ অথচ ভাব দেখে মনে হচ্ছে বিশ্বকাপ জিত্তা গেছে”।
অবশ্য ম্যাচ জয়ের পর থেকে ব্রাজিল সমর্থকদের দুয়োর জবাবও কোমর বেঁধে দিতে শুরু করেছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা।

মাজহারুল ইসলাম ফেসবুকের একটি কমেন্টে লিখেছেন, “৫ বালতি সমবেদনা ঐসব ব্রাজিলিয়ান ফ্যানদের জন্য, যারা ভেবেছিল আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না। ওহে হেটাররা তোমরা হয়তো জানতে না, সবকিছুর শেষ যেখানে বস মেসির শুরু সেখান থেকেই… হ্যাট্রিক”!

সব প্রতিপক্ষ সমর্থকই যে আর্জেন্টিনাকে দুয়ো দিচ্ছেন বা সমালোচনা করছেন তা নয়, অনেকে অভিনন্দনও জানাচ্ছেন।
শেখ রোকন ফেসবুকে লিখছেন, “বিশ্বকাপে চান্স পাইছো, অভিনন্দন বাছারা! সাবধান, জার্মানির সামনে পইড়ো না”। নিঃসন্দেহে চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সমর্থক মি. রোকন।

আর ম্যাচ জয়ের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে অবধারিতভাবেই শুরু হয়ে গেছে মেসি বন্দনা।
মিলন কুমার বালা ফেসবুকে লিখেছেন, “মেসি, তুমি আবার তোমার জাত চেনালে”।

নাঈম নীল লিখেছেন , “ওস্তাদের মার শেষ রাতে কথাটা আরও একবার সঠিক প্রমাণিত হল”।
তবে আজ ভোরের ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা জেতার পর ভক্ত শিবিরে যে স্বস্তি নেমে এসেছে, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।
সেটা যে শুধু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশী ভক্তদের পোস্টে বোঝা গেছে তা নয়, বিদেশী ভক্তদের লেখাতেও বোঝা গেছে।

টুইটারে ব্রজেল খানাল নামে এক ভারতীয় লিখেছেন, “মেসিকে ধন্যবাদ, আমাকে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ দেখতে দেয়ার জন্য”। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে তখন #মেসি হ্যাশট্যাগটি টুইটারের সেরা চারটি হ্যাশট্যাগের মধ্যে রয়েছে।
আর বাংলাদেশের মেনহাজুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেছেন, “আর্জেন্টিনা যদি বিশ্বকাপ নাও খেলতো, তবু আমি ওদের পতাকা নিয়ে প্রতিটা ম্যাচের সময় বসে থাকতাম। সবাই হাল ছাড়লে ছাড়ুক, দূরে থাকুক, টিম ছেড়ে চলে যাক। আমি আর্জেন্টিনা ছাড়া কিচ্ছু বুঝিনা, ভবিষ্যতে বুঝবোও না! কথা একটাই আমি মরে যাবার পরও কেউ না কেউ আর্জেন্টিনার পতাকা আগলে বসে থাকবে, বিভোর হয়ে স্বপ্ন দেখবে, স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় চোখের জল মুছে বলবে এবার হলো না, পরেরবার হবে। ভালোবাসার সুখ এখানেই। জিতে যতখানি সুখ, হেরে যাওয়ার সুখ তার চেয়ে কম নয়! হারলে বুঝতে পারি ভালোবাসার পরিমাণটা কতটুকু”?-বিবিসি