‘মেসিতে শক্তি, মেসিতে মুক্তি’ !

নয় হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত অলিম্পিক অ্যাতহালপা যখন সমুদ্রের গভীরতা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, তখন আকাশে ওড়ার মন্ত্র দিলেন তো ওই একজনই- লিওনেল মেসি। ‘সর্বকালের সেরা কি-না’ এ বিতর্ক হয়তো কখনই মীমাংসা হবে না। কিন্তু কুইটোতে গতকাল আর্জেন্টাইন তারকা যা করলেন, আর্জেন্টিনার বাছাইপর্বের শেষটা যেভাবে হলো, তার সঙ্গে কি তুলনা হয় আর কোনো খেলোয়াড়ের, কোনো দেশের?

ইকুয়েডরের বিপক্ষে নামার আগে যত রকমের প্রতিকূলতা সম্ভব, তার প্রায় সবই ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। শুধু আর্জেন্টিনা বললে অবশ্য ভুল বলা হবে। প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বকাপ নিশ্চিতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সম্ভবত মেসিরই। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী, সময়ের সেরা খেলোয়াড়, ‘ভিনগ্রহে’র একজন হিসেবে প্রশংসিত- এমন একজন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ না খেলতে পারা মানে যে খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য আর শ্রেষ্ঠত্বের স্বর্ণালি ক্যারিয়ারে কালির দাগ পড়ে যাওয়া!

না, অত নিষ্ঠুর ভাবনার সুযোগ দেননি মেসি। প্রায় একা হাতেই দলকে টেনে তুললেন বিশ্বকাপে। নিজেকেও নিয়ে গেলেন নতুন উচ্চতায়। ইকুয়েডরকে আর্জেন্টিনা হারাল ৩-১ গোলে, তিনটি গোলই মেসির! এ যেন একটি হ্যাটট্রিক নয়, মেসি নামের ফুটবল জাদুকরের তিনটি স্ট্মারক, তিনটি নজির! পয়েন্ট টেবিলের ছয় নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য জয়ের বিকল্প ছিল না।

কিন্তু প্রতিপক্ষ আর প্রতিপক্ষের কন্ডিশন, নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা আর বর্তমান ফর্মহীনতা- সব মিলিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। স্টেডিয়ামের অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার মিটার উচ্চতায় হওয়ার কারণে সব সময়ই ভিনদেশিদের শ্বাসকষ্টে ভোগার শঙ্কা থাকে। কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সঙ্গে ছিল ইকুয়েডরের বিপক্ষে সাফল্য খরার।

এ মাঠে খেলতে আসা সর্বশেষ তিন ম্যাচের একটিতেও জয় ছিল না। শেষ জয়টি সেই ১৬ বছর আগে। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে ইকুয়েডর চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে যে কোনো মাঠেই। বিশ্বকাপ বাছাইয়েরই প্রথম লেগে নিজেদের বুয়েন্স আয়ার্সেই ইকুয়েডরের কাছে ২-০ গোলে হেরে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এর সঙ্গে ছিল বর্তমান দুরবস্থাও।

শেষ তিন ম্যাচেই ড্র করে পয়েন্ট খোয়ানো, গত নভেম্বরের পর থেকে মেসি ছাড়া আর কোনো খেলোয়াড়ের গোল না পাওয়া, চোটে আক্রান্ত হয়ে সার্জিও অ্যাগুয়েরোর না থাকা- সব মিলিয়ে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ ছিল সম্মুখে। সেই চ্যালেঞ্জই পাহাড়সম হয়ে উঠল গতকাল ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার পরপরই। নিজেদের গুছিয়ে নেওয়া দূরে থাক, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্জেন্টিনার জালে ইকুয়েডরের গোল!

চাপের ম্যাচে মেসি গুটিয়ে যান বলে এক ধরনের কথা প্রচলিত আছে। এবার তো কেবল চাপ নয়, মহাচাপের চেয়েও বেশি কিছু! কুইটোর নয় হাজার ফুট ওপর থেকে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার অবস্থা!
কিন্তু মেসি-ম্যাজিক যে তখন বাকি! ১২ মিনিটের মাথায় অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার সহায়তায় গোল করে আনলেন সমতা। এর আট মিনিট পর প্রতিপক্ষ রক্ষণের খানিক ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলকে দিলেন এগিয়ে।

আর দ্বিতীয়ার্ধে জয় নিশ্চিতের গোলটি করলেন প্রায় একক প্রচেষ্টায়, তিন ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে। এই গোল কেবল আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত কিংবা মেসির হ্যাটট্রিক গোলই নয়, বাছাইপর্বের অন্যতম দর্শনীয় গোলও বটে। দল উদ্ধার করা এই গোলের সুবাদে নিজের ক্যারিয়ারও হলো আরেকটু সমৃদ্ধ। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তার গোল এখন ২১টি, লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যা সর্বোচ্চ। এবারের বাছাইয়ে মেসি অবশ্য সব ম্যাচ খেলতেও পারেননি।

নিষেধাজ্ঞা আর চোটের কারণে ১৮ ম্যাচের আটটিতেই খেলতে পারেননি। আর্জেন্টিনা যে এবার মেসিতে ভর করেই বিশ্বকাপে উঠেছে, তার আরেক দৃষ্টান্ত মেসির না খেলা ম্যাচগুলো। মেসিবিহীন আট ম্যাচে আর্জেন্টিনার অর্জন মোটে ৭ পয়েন্ট! দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ দিন পর্যন্ত যে অপেক্ষা করতে হলো, তার কারণ পয়েন্টের ওই স্বল্পতাই।

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে নামি স্ট্রাইকার সরবরাহ করা আর্জেন্টিনা ভুগেছে বেশি গোলখরায়। গত বছরের নভেম্বরে চিলিকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচে গোল করেছিলেন ডি মারিয়া। তার পর থেকে গত এগারো মাসে মেসি ছাড়া আর কেউই গোল করতে পারেননি। মাঝে ভেনিজুয়েলা ম্যাচে এক গোল হয়েছিল আত্মঘাতী।

১৭ ম্যাচে ১৬ গোল করতে পারা আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফিরল মেসির সৌজন্যেই। মেসিই এগিয়ে নিয়েছিলেন আগের ম্যাচগুলোতে, শেষবেলায় উদ্ধারও করলেন ৩১ বছর বয়সী এ স্ট্রাইকারই। আর্জেন্টিনা শক্তি আর মুক্তি- দুটিই যে মেসি, এতে আর সংশয় কি?