আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন

বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সমাজে যত রকম অঘটন ঘটছে তার মূলে রয়েছে ধৈর্যচ্যুতি। কারো পক্ষেই যেন ধীরে-সুস্থে, আলোচনা বা যথাযথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোনো সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়! এ অবস্থা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই বিরাজমান।

এ কারণেই অন্যায়-অবিচার কোনো অশান্তিরই কমতি নেই। ধৈর্যচ্যুক্তিই চারিত্রিক-মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষকে মুহূর্তে অমানবিক আচরণে বাধ্য করে। সম্ভাবনাময় মানুষ সঠিক পথে উপার্জন করতে না পেরে ধৈর্যচ্যুত হয়ে চুরি-ছিনতাই-স্মাগলিংয়ের মতো অন্যায় পথে পা বাড়িয়ে নিজের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে। একইভাবে একজন সৎ, নীতিবান, আদর্শবাদী মানুষ কোনোরকম চাপের মুখে পড়ে ধৈর্যহারা হয়ে রাতারাতি অসৎ হয়ে পড়ে।

এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্ত রাখতে ও তার সর্বাঙ্গীন কল্যাণের জন্য ইসলাম মানুষকে বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, অসুখ-বিসুখ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৈর্যধারণের শিক্ষা দিয়ে বলে-

* ‘তোমরা ধৈর্যধারণ কর, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর।’ [সূরা-আলে-ইমরান : ২০০]

* ‘হে মু’মিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে (আল্লাহর নিকট) সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।’- [সূরা বাকারাহ : ১৫৩]

* ‘যারা ধৈর্যধারণ করে আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যা করে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করবো।’- [সূরা নাহল ৯৬]

* ‘বস্তুত ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার পুরোপুরিভাবেই দেয়া হবে।’ [সূরা-যুমার : ১০]

* ‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’- [সূরা আলে-ইমরান : ১৪৬]

শুধু বাণীর মাধ্যমেই ইসলাম অনুসারীদের ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করেনি বা নির্দেশ দেয়নি বরং তার দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ডকেও এমন সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে দিয়েছে যাতে সে স্বাভাবিকভাবেই ধৈর্যধারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন : নির্ধারিত সময়ে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়, রমজান মাসে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সিয়াম পালনসহ নির্ধারিত সময়ে সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি, হজ সম্পাদন প্রভৃতি। আমাদের নিত্যদিনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সূক্ষ্মভাবে নজর দিলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, স্রষ্টা স্বয়ং তাঁর নির্ধারিত নিয়মে আমাদের জন্য ধৈর্যের অনুশীলনের বিষয়টি নিহিত রেখেছেন। যেমন : স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী আমরা বেচাকেনা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ দিনের বেলায় সম্পন্ন করি আর রাতের বেলা বিশ্রাম করি।

একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে এ নিয়ম আমাদের গড়া নয় বরং স্রষ্টাই তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাগুণে দিন রাতের ব্যবধানের পাশাপাশি মানুষের অভ্যাসকেও এভাবে গড়ে দিয়েছেন। এখন আমরা যত চেষ্টা সাধনাই করি না কেন স্রষ্টা না চাইলে এ চিরাচরিত নিয়ম পরিবর্তন আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবেই দিনের বেলা রাতের আর রাতের বেলা দিনের অপেক্ষায় ধৈর্যধারণের অনুশীলন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমরা ধৈর্যহারা হয়ে ভুল পথে পা বাড়াই এবং নিজের ও মানবসমাজের অকল্যাণ ডেকে আনি। বলার অপেক্ষা রাখে না ধৈর্যধারণ করা খুবই কঠিন ও কষ্টসাধ্য কাজ। তবে এ এমন এক গুণ যা মানুষকে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ক্ষেত্রে সাফল্যমণ্ডিত করে। যে কোনো ধরনের সঙ্কট মোকাবেলা বা প্রতিকারের ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণপূর্বক স্রষ্টার সাহায্য প্রার্থনা করে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

ধৈর্যের মতো অতুলনীয় মহৎ গুণই মানুষকে বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত রেখে দিতে পারে চূড়ান্ত সাফল্য। চূড়ান্ত সাফল্য বলতে তাই বোঝায় যাতে স্রষ্টার সন্তুষ্টি নিহিত। আর স্রষ্টার সন্তষ্টিই মানুষের ইহকালীন পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত করে। তাই, এ নিশ্চিত নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের প্রত্যেকের পবিত্র কর্তব্য হলো অনুক্ষণ ধৈর্যের অনুশীলন করে যাওয়া যাতে যথাসময়ে ধৈর্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব হয়। কেননা এর বিনিময়ে লাভ করা সম্ভব হবে অপরিমিত পুরস্কার- যার ঘোষণা স্বয়ং স্রষ্টা দিয়েছেন।