ওয়াই ফাই রাউটার কেনার আগে যা জানা দরকার

বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট মানুষের মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়েছে। আগে বেশীরভাগ ব্যবহারকারী ডেস্কটপ কম্পিউটার থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। এখন ধীরে ধীরে ডেস্কটপ থেকে ল্যাপটপ কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। আজকাল মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে। সঙ্গে ইন্টারনেট টিভি, স্মার্টহোম যন্ত্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকছে তারহীন ইন্টারনেটের মাধ্যমেই।

আর এই তারহীন ইন্টারনেটের জন্য যে যন্ত্রটি জরুরি, সেটা ওয়াই-ফাই রাউটার। বাসায় কিংবা অফিসে একটা ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করতে রাউটার লাগবেই। বাজারেও আছে নানা দামের নানা মানের রাউটার। কিন্তু কার জন্য কেমন রাউটার প্রয়োজন—এটা জানা দরকার।

কেন ওয়াই-ফাই রাউটারঃ

শুধু একটি মুঠোফোন বা ডিভাইসে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু করে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইন্টারনেট যদি একাধিক যন্ত্রে ব্যবহার করতে হয় তবে আর এক প্যাকেজ দিয়ে ব্যবহার সম্ভব নয়। প্রথমত মুঠোফোন বা ডেস্কটপে যুক্ত ইন্টারনেট সংযোগটি অন্য যন্ত্রগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করার সুযোগ নেই। আরেকটি কারণ, মুঠোফোনের ইন্টারনেট প্যাকেজ তুলনামূলক ব্যয়সাপেক্ষ। একই খরচের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কিংবা ওয়াইম্যাক্স সংযোগে কয়েক গুণ বেশি গতির এবং বেশি ডেটা ভলিউমের প্যাকেজ ব্যবহার করা সম্ভব।

কাজের ধরন বুঝে রাউটার কিনুনঃ

একটি ইন্টারনেট সংযোগ থেকে একাধিক ব্যবহারকারী এবং একাধিক মুঠোফোন ও কম্পিউটারে ব্যবহার করার উপায় হলো সে সংযোগের সঙ্গে একটি ওয়াই-ফাই রাউটার যুক্ত করে নেওয়া। বাজারে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বিভিন্ন ধরনের রাউটার আছে। কাজের ধরন অনুয়ায়ী বেছে নিতে হবে আপনার রাউটার। অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির রাউটার যে কিনতেই হবে এমন নয়। বরং রাউটার কী ধরনের কাজের জন্য ব্যবহার করা হবে, তার ওপর নির্ভর করেই নির্বাচন করা উচিত।

মাথায় রাখুন রাউটারের ব্যান্ডঃ

সিঙ্গেল, ডুয়েল এবং ট্রাই ব্যান্ড রাউটার হয়ে থাকে। সহজভাবে বলতে গেলে যে কয়েকটি ব্যান্ড থাকে রাউটারে ওই সংখ্যক নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে। সিঙ্গেল ব্যান্ড রাউটারগুলোর ব্যবহার বেশি। এতে ২.৪ গিগাহার্টজের একটি নেটওয়ার্ক থাকে। ডুয়েল ব্যান্ডে ২.৪ গিগাহার্টজের পাশাপাশি ৫ গিগাহার্টজের আরও একটি নেটওয়ার্ক থাকে। ৫ গিগাহার্টজের নেটওয়ার্ক উচ্চগতিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। কিন্তু এই উচ্চগতির কারণেই দেয়াল বা বড় কিছু অতিক্রম করে সিগন্যাল পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

ট্রাই-ব্যান্ডের রাউটারে একটি ২.৪ গিগাহার্টজের এবং দুটি ৫ গিগাহার্টজের নেটওয়ার্ক থাকে। একাধিক নেটওয়ার্ক থাকার উদ্দেশ্য হলো উচ্চগতির যন্ত্র এবং তুলনামূলক কম গতির যন্ত্রগুলো যেন কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়া তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।আপনি যদি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের গতি নিয়ে ভাবনায় থাকেন এবং একই সঙ্গে রাউটার থেকে ১০টির বেশি যন্ত্রে ব্যবহার করতে চান, তবেই কেবল ট্রাই-ব্যান্ড রাউটার কিনতে পারেন। বাসা বা ছোট অফিসের সাধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য ২.৪ গিগাহার্টজের রাউটারই যথেষ্ট।

ওয়্যারলেস মান জেনে নিনঃ

802.11 a, 802.11 b/g/n, 802.11 ac-এর মতো বেশ কয়েকটি ওয়্যারলেস মান রয়েছে। আপনার কম্পিউটারটি যদি গত কয়েক বছরের মধ্যে কেনা হয়ে থাকে তবে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় এটি 802.11n নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। প্রায় ছয় বছর ধরে এই নেটওয়ার্কই বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
802.11 ac নেটওয়ার্ক স্ট্যান্ডার্ডটি সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হয়ে থাকলেও সব যন্ত্রে এখনো রাউটারের এই মান সমর্থন করছে না। কিন্তু আপনি যদি আপনার যন্ত্রগুলো হালনাগাদ করার পরিকল্পনা করে থাকেন তবে 802.11 ac স্ট্যান্ডার্ডের রাউটার কিনতে পারেন। সাধারণত এই রাউটারগুলোতে আগের স্ট্যান্ডার্ডের ডিভাইস যুক্ত করার সুযোগও থাকে।

চাইলে বহনযোগ্য রাউটারঃ

সাধারণ রাউটারের পাশাপাশি বহনযোগ্য বা পোর্টেবল রাউটারও ব্যবহার করা যেতে পারে। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবির মতো মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরভিত্তিক থ্রিজি অথবা কিউবি, বাংলালায়নের মতো ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট সংযোগগুলোতে একই সঙ্গে একাধিক যন্ত্র যুক্ত করার জন্যও রাউটার ব্যবহার করা যেতে পারে।বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তৈরি থ্রিজি নেটওয়ার্ক সমর্থন করে এমন বিভিন্ন মডেলের পোর্টেবল রাউটার বাজারে রয়েছে। এই ধরনের রাউটারের সঙ্গে যেকোনো মোবাইলের সিমকার্ড ব্যবহার করে রাউটার সক্রিয় করা যায়।

কোনো কোনো টেলিযোগাযোগ সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠান আবার নিজেরাই এই ধরনের যন্ত্রগুলো তাদের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে।পোর্টেবল রাউটারের মাধ্যমে ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট ব্যবহার করতে চাইলে নির্দিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই এই রাউটারগুলো কিনতে হবে। আবার এক প্রতিষ্ঠানের রাউটার অন্য প্রতিষ্ঠানের সংযোগের জন্য কার্যকর নয়। সেটাও মাথায় রাখতে হবে।

পোর্টেবল রাউটারগুলো পূর্ণ চার্জে সাধারণত তিন-পাঁচ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। চলার পথে ব্যবহার করার জন্য এই রাউটারগুলো বেশ কার্যকর। এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেসব স্থান থেকে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত কি না।

আপনার রাউটারের আরো সুবিধা পেতে ভালো করে কয়েকটি বিষয় জেনে নিন। যেমন-

৩জি ৪জি মডেম সাপোর্টঃ

অনেক রাউটার আছে যেগুলো তে মডেম ব্যবহার করা যায়। সেসব রাউটারে ইউএসবি পোর্ট থাকে এবং ওয়ান পোর্ট ও থাকে যাতে ব্রডব্যান্ড এর লাইন ব্যবহার করা যায়। কিন্তু মনে রাখবেন মডেমটি অবশ্যই অটো কানেক্ট করার কাপাবিলিটি থাকতে হবে। সব রাউটার সব মডেম সাপোর্ট করে না। রাউটারের ওয়েবসাইটে মডেম কম্পাটিবিলিটি লিস্ট দেয়া আছে। যারা বাংলালায়ন আর কিউবি মডেম ব্যবহার করতে চান অটো কানেক্ট হয় এমন মডেম নিতে হবে ওদের কাছ থেকে। আপনি যদি সিওর না হয়ে থাকেন তাহলে কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে জেনে নিবেন।

এডিএসএল সাপোর্টঃ

আমাদের দেশে বিটিসিএল টেলিফোন সেট দিয়ে ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে থাকেন। বিটিসিএল এর কানেকশন এর জন্য এডিএসএল রাউটার লাগবে।

ইউএসবি কানেকশনঃ

রাউটারে ইউএসবি কানেকশন থাকলে আপনি এফটিপি সার্ভার হোস্ট করতে পারবেন। কারন আপনি সহজেই ইউএসবি স্টোরেজ ডিভাইস কানেক্ট করতে পারবেন।

ক্লাউড সাপোর্টঃ

আপনি বাসার বাইরে থেকেও রাউটার কন্ট্রোল করতে পারবেন।

ভিপিএন সাপোর্টঃ

মনে করুন আপনার বাসা মিরপুরে। আপনার বাসায় প্রাইভেট আইপি তে আপনি ফাইল সার্ভার হোস্ট করেছেন এখন আপনি চাচ্ছেন আপনার সার্ভারটি আপনার বন্ধু গুলশান থেকে এক্সেস করুক। সাধারনত এটি সম্ভব না। কিন্তু ভিপিএন সাপোর্টেড রাউটার দিয়ে এই কাজটি করা সম্ভব।

পোর্টাবিলিটিঃ

কিছু রাউটার আছে যেগুলো মোবাইলের সিম ব্যবহার করা যায়। ডিভাইসে একটা ব্যটারি থাকে যেটা চার্জ দিয়ে বাসার বাইরে রাউটার ব্যবহার করা যায়।

রাউটার ব্যবহারে যা জানতে হবেঃ

* রাউটারের ওয়াই-ফাই সক্রিয় করার সময় ডিফল্ট নেটওয়ার্ক হিসেবে ওই রাউটারের নাম উল্লেখ থাকে এবং পাসওয়ার্ডও রাউটারে নিচের দিকে একটি স্টিকারে লেখা থাকে। প্রয়োজনে ব্যবহারের নির্দেশিকা দেখে পদ্ধতিটি জেনে নেওয়া যেতে পারে।

* প্রথমবার রাউটার সংযুক্ত করে ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের নাম পরিবর্তন করে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ডও ব্যবহার করা উচিত। পাসওয়ার্ড দেওয়া না থাকলে যে কেউই রাউটারে যুক্ত হতে পারবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এমন অবস্থা কখনোই রাখা উচিত নয়।

* রাউটারের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে সেটি রিসেট বা পুনরায় নির্ধারণ করে নেওয়া যায়। সাধারণত রাউটারের পাশে একটি বোতাম চেপেই এই কাজটি করা যায়।

* রাউটার সাধারণত বাসার মাঝামাঝি স্থানে রাখা উচিত। এর ফলে অন্যান্য ঘর থেকে সহজে রাউটারের ওয়াই-ফাই সংযোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে।

* কত বড় জায়গায় ওয়াই-ফাই সংযোগ দিতে চান, তার ওপর নির্ভর করে রাউটার পছন্দ করুন।

* রাউটারে একই সঙ্গে একাধিক লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক সংযোগ যুক্ত করা হয়। অধিকসংখ্যক ল্যান সংযোগ যুক্ত করতে হলে রাউটার কেনার সময় সেটি দেখে নেওয়া উচিত।-তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো ও ইন্টারনেট