সাংবাদিকের প্রশ্নে রেগে গেলেন অর্থমন্ত্রী

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনেই রেগে গেলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এবারের বাজেটকে অনেকেই ‘গরিব মারার’ বলছেন এমন প্রশ্নে ‘ক্ষেপে’ গিয়ে অর্থমন্ত্রী সব সংবাদিকদের করা প্রশ্নকেই ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন অর্থমন্ত্রী। এরপর নানা মহল থেকেই বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে।

তবে, বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশিবার যে শব্দ দুটি উচ্চারিত হয়েছে সেগুলো হলো, ‘গরিব মারার ও ভোটার তুষ্টির বাজেট’। এছাড়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংগঠনও বাজেটের নানা সমালোচনা করেছেন। বাজেটে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কর প্রস্তাব নিয়েও নানা মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়।

প্রতিক্রিয়ায় সিপিডি’র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আবাসন কেনার ক্ষেত্রে একটা বড় চাপ সৃষ্টি করা হলো। আর যারা সচ্ছল মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত আছে তাদের জন্য আবার ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এটা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে, বাংলাদেশে বাসস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একধরনের বৈপরীত্য।’

এই বিষয়টি নিয়ে আজ শুক্রবার (৮ জুন) সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রশ্নটি এরই মধ্যে অনেকেই বলে ফেলেছেন, অনেকেই বলছেন এই বাজেট ধনী বান্ধব বাজেট এবং গরিব মারার বাজেট। ছোট ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে আপনি ট্যাক্স বাড়ালেও বড় ফ্ল্যাটে আপনি ট্যাক্স বাড়াননি। এটা কি আসলে গরিব মারার বাজেট কিনা?

এরপর অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে উত্তরের প্রত্যাশায় বসেন ওই সাংবাদিক। তবে, অর্থমন্ত্রী প্রশ্নটি আবারও শুনতে চান। এরপর তিনি পুনরায় প্রশ্নটি করতে থাকলে তার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী তাকে বসতে বলেন।

এ সময় নড়চড়ে বসে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আপনারা যে প্রশ্ন করছেন এগুলো একেবারেই মিনিংলেস (অর্থহীন) হয়ে যাচ্ছে। এখানে কোনো কিছু জানতে চেয়ে কোনো প্রশ্ন করা হচ্ছে না।’

সাংবাদিকদের প্রতি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি জানতে চান, ‘বাংলাদেশ এখন কী অবস্থায় আছে আপনারা জানেন? এদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে?

তিনি আবারও বলেন, ‘কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দেন। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে?

এরপর রুদ্রমূর্তি ধারণ করে নিজেই উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘এদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে না। যে বলে বাড়ছে হি ইজ জাস্ট লায়িং (তিনি মিথ্যা বলছেন), অফ কোর্স লায়িং (অবশ্যই মিথ্যা বলছেন)। বৈষম্য বাড়েনি। কয়জন দরিদ্র দেশে আছেন? আপনারা এমন সব প্রশ্ন করছেন যে এগুলো নিয়ে বলতেও আমার লজ্জা করে।’

এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী আরও চটে যান। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে তিনি বলেন, ‘একটা দেশের লোকজন এরকম কী করে হতে পারে? এই যে সাংবাদিকরা, এক একজন সাংবাদিক শিক্ষিত লোক, তারা দেশের পরিবর্তন স্বীকার করেন না। বাংলাদেশে এখন ২২ শতাংশ লোক গরিব। আপনাদের যখন জন্ম হয়েছে, আপনাদের জন্মের আগে এ সংখ্যা ছিল ৭০ শতাংশ। বোঝেন কোথায় ছিল বাংলাদেশ এবং কোথায় এসেছে।

এই কিছুদিন আগে ৩০ শতাংশ লোক ছিল গরিব। ৭ বছর আগে সাড়ে ৩০ শতাংশ দরিদ্র ছিল, আজ ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। যারা চূড়ান্ত গরিব, তাদের সংখ্যা ছিল ১৮ শতাংশ। এখন ১১ শতাংশ। কোন মুখে আপনারা বলেন, এই দেশে গরিব মারার বাজেট হচ্ছে, ধনীকে তেল দেওয়ার বাজেট হচ্ছে? বলেননি, কিন্তু বোঝাতে চাচ্ছেন দেশের উন্নয়ন কিছুই হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা বাজেট দেখেননি। আপনারা কোনোভাবেই এই বাজেটের সমালোচনা করতে আসেননি এখানে। আপনাদের কিছু গঁৎবাঁধা প্রশ্ন আছে। সেই প্রশ্ন করতেই আপনারা এখানে এসেছেন।’

এরপর পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘সুপ্রিয় বন্ধুগণ আপনারা আস্তে আস্তে মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করবেন। তিনি একটি একটি প্রশ্নের জবাব আপনাদের দেবেন। যতক্ষণ আপনারা সন্তুষ্ট না হবেন আমরা ততক্ষণ চেষ্টা করব আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার।

পরবর্তীতে অবশ্য অর্থমন্ত্রী ‘ঠান্ডা মেজাজেই’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

বাজেটোত্তর এ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত রয়েছেন, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অর্থ প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, তৌফিক-ই- ইলাহী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আযম এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন।-সূত্র: সময় নিউজ।