স্বপ্নের নাম নেইমার

রাশিয়ার বিশ্বকাপে সবচেয়ে আশাজাগানিয়া দল হিসেবে যাচ্ছে ব্রাজিল। এবারের বিশ্বকাপ জয়ের বাজির দরে সবচেয়ে এগিয়ে সেলেসাওরা। নেইমারকে ঘিরেই এবার দল সাজিয়েছে ব্রাজিল। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারেই বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। জোগো বনিতো ফুটবলের প্রেমী নেইমার ব্রাজিলকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন চেনা রূপে। বিশ্বকাপের আগে চলুন দেখে নেওয়া যাক ব্রাজিলের তুরুপের তাসের আদ্যোপান্ত

শৈশব
১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মগি দাস ক্রুজেসে জন্ম হয় নেইমারের। তার বাবা ছিলেন গাড়ি মেরামতের কারিগর। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিলেও মেধাগুণে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছেন তিনি। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ধনী ফুটবলার নেইমার।

জাতীয় দলে
১০ আগস্ট ২০১০ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলে অভিষেক হয় নেইমারের। ফরোয়ার্ড কিংবা লেফট উইং পজিশনেই খেলে থাকেন তিনি। এর পর থেকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। পুরো বিশ্ব বুঁদ হয়ে উপভোগ করছে তার ফুটবল জাদু। রোনালদোর দুই পায়ের শট, রোমারিওর ভারসাম্য আর বক্সের মধ্যে ক্ষিপ্র চিতার রূপ, রিভালদোর ঠা-া মাথার ফিনিশিং, সতীর্থদের অবস্থান বুঝে নেওয়ার কাকার অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা, রবিনহোর ড্রিবলিংÑ এই সবকিছুর সমন্বয় আছে একজনের মধ্যে। সেই একজন নেইমার দ্য সিলভা সান্তোস জুনিয়র। নেইমারকে এতগুলো বিশেষণেই বিশেষায়িত করে থাকে ব্রাজিল এবং বিশ্বের অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো। তবে সবকিছুর পর নেইমার শুধুই নেইমার। তিনি সবার চেয়ে স্বতন্ত্র। আলাদা একটি স্টাইল আছে তার। সহজাতভাবেই জোগো বনিতোর (সুন্দর ফুটবল) প্রেমিক তিনি।

বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার
ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোস থেকে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান নেইমার। এর পর নিজেকে মেলে ধরেন বিশ্বের সামনে। নেইমারের খেলায় মুগ্ধ হয়ে বিশ্বের সব নামিদামি ক্লাব তাকে পেতে লাইন দেয়। বার্সেলোনা থেকে ফ্রান্সের ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ে পাড়ি জমান নেইমার। ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফ্রান্সে যান নেইমার। বনে যান বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে দামি ফুটবলার। তার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা! বিস্ময়কর হলেও সত্যি।

স্বপ্নজয়ের মিশন
গত আসরে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা যে সুখকর নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজের দেশে বেলো হরিজন্তে জার্মানির কাছে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় সেলেসাওদের। সেই অভিশপ্ত রাতের ছবি আজও ব্রাজিল ভক্তের স্মৃতিতে টাটকা। জার্মানি শুধু এগারোজনকে মাঠে (৭-১) হারায়নি সে রাতে, বরং একটা ফুটবল সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিল, যে যন্ত্রণা থেকে আজও পুরোপুরি বেরোতে পারেনি ব্রাজিল। কোপার কোয়ার্টারে হার। শতবর্ষের কোপায় আরও খারাপ। গ্রুপেই বিদায়। সেই ঐতিহাসিক হলুদের দাপট যেন কোথাও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অলিম্পিকের শিরোপা জয় করে হয়তো সেই শাপ কিছুটা মোচন করেছে নেইমারের ব্রাজিল। দুবছর আগে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে নেইমার ছিলেন না। ডাগআউটে বসেই দেখতে হয়েছিল, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ব্রাজিলের স্বপ্ন। এবার কি সেই ওয়ান্ডারকিড যন্ত্রণা ভুলিয়ে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হতে পারবেন? বিশ্বকাপের বাছাই পর্বেই ঝলক দেখিয়েছে ব্রাজিল। নেইমারের দল স্বাগতিক রাশিয়ার পর সবার আগে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে। গ্রুপ সেরা হয়ে কোয়ালিফাই করেছে বিশ্বকাপে। বাছাই পর্বের ম্যাচগুলোয়ও দাপট দেখিয়েছে হলুদ শিবির। ইনজুরির কারণে লম্বা সময় মাঠের বাইরে থাকলেও দলে ফিরেই নিজেকে মেলে ধরেছেন নেইমার। দলের হাল ধরেছেন শক্ত হাতেই। এবারের বিশ্বকাপে নেইমারের হাত ধরে শাপমোচন করবে ব্রাজিল? হেক্সা মিশনে নেইমার কি পারবে দলকে সঠিক পথ দেখাতে? তা সময়ই বলে দেবে।

মাঠের বাইরে নেইমার
মাঠের মধ্যে নেইমার যদি দলের আশার আলো হন, তা হলে মাঠের বাইরের আশঙ্কার নামও কিন্তু নেইমার। ওয়ান্ডারকিড যেমন ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে গোল করতে অভ্যস্ত, ঠিক তেমনই আবার পার্টি করার জন্যও বিখ্যাত। ওয়ান্ডারকিডের নৈশজীবন নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সাংবাদিককে কটাক্ষ করে নেইমার বলেছিলেন, ‘ম্যাচের আগের রাতেও আমার পার্টি করতে কোনো সমস্যা নেই।’ এমনটা তিনিও করেছিলেনও। ওয়ান্ডারকিডের এই পার্টি লাইফস্টাইলই এখন বিতর্কে। কেউ কেউ মনে করেন, মাঠে অবশ্যই এর প১্রভাব পড়বে। আবার কেউ কেউ আশাবাদী। তবে প্রতিটা বড় টুর্নামেন্টে নেইমারের শেষটা হয় যন্ত্রণা দিয়েই। বিশ্বকাপে চোট পাওয়ার পর থেকে কোপায় কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখা, ওয়ান্ডারকিডের গায়ে ব্রাজিল জার্সি মানেই যেন অঘটন। এবারের বিশ্বকাপের আগেও নেইমারের ব্রাজিলের হয়ে খেলা নিয়ে ছিল সংশয়। চোটের কারণে একদিকে ব্রাজিল ফুটবলের কর্তা এবং পুরো বিশ্ব যখন দুশ্চিন্তার প্রহর গুনছে, তখনো আমুদে মেজাজেই ছিলেন এই তারকা। বিশ্বকাপের আগে অবশ্য ব্রাজিল শিবির ও নেইমারকে দেখলে কেউ বলবেই না এঁদের ওপর কোনো চাপ আছে। বরং ফুর্তি এবং শরীরে ট্যাটু করিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। নিজেদের শেষ প্রীতিম্যাচে গোল করেই জার্সি খুলে পুরো শরীরের ট্যাটু প্রদর্শন করেন নেইমার। মাঠে এবং মাঠের বাইরে চঞ্চল নেইমার।

বান্ধবী
খুব অল্প বয়সেই বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছেন এ তারকা। তবে শুধু ক্যারিয়ারে নয়, প্রেমের রাজ্যেও অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। পোশাক পাল্টানোর মতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে নেইমারের বান্ধবী পাল্টানো। বান্ধবীদের বেশিদিন ধরে রাখেন না বার্সার এ তারকা। ২১ রমণীর মন ভেঙে বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রী ও মডেল ব্রুনা মার্কুইজিনের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। ২০১৪ সালে তাদের একবার বিচ্ছেদ হলেও আবার সম্পর্ক হয়েছে তাদের। শুধু তা-ই নয়, নেইমার বিশ্বকাপ জয় করতে পারলে তারা বিয়ে করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন ব্রুনা।

শখ
বিলাসবহুল জীবনযাপনে নেইমারের জুড়ি নেই। বিশ্বের দামি দামি স্পোর্টস কার কেনা নেইমারের শখ। ছুটির দিনে বা অবসরে লং ড্রাইভে যেতে পছন্দ করেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।