‘ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে এই ক্রোয়েশিয়াই ছিল বাংলাদেশের সারিতে’

রাশিয়া বিশ্বকাপের ২১তম আসর শুরু থেকেই নতুনদের আগমনী বার্তা দিয়ে এসেছে। পুরো টুর্নামেন্টে হট ফেভারিটদের চেয়ে এবার নতুনদের পারফরম্যান্সই ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই নতুনদের মধ্যে অন্যতম ক্রোয়েশিয়া। যারা কিনা ৩২ দলের প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই চমক দেখিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

অথচ একটা সময়ে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে এই ক্রোয়েশিয়াই ছিল বাংলাদেশের সারিতে। সময়টা ১৯৯৩ সাল। সেই সময়ে ফিফা র‌্যাংকিয়ের ১১৯তম দল ছিল বাংলাদেশ। তার ঠিক দুই ধাপ আগেই ছিল ক্রোয়েশিয়ার অবস্থান। আর বাংলাদেশ থেকে পাঁচ ধাপ নিচে ছিল বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে খেলা পানামা।

আরেকটু সামনে তাকানো যাক। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পৌঁছেছিল ১১০তম স্থান পর্যন্ত। সময়টা ১৯৯৬ সালের ১ এপ্রিল। ১৯৯৪ সালের মার্চে এই ক্রোয়েশিয়ার অবস্থান ছিল ১২৫তম স্থানে। সেটা ছিল ১৯৯২-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। আর তখন বাংলাদেশের অবস্থানটা ছিল ১১০ থেকে ১২০-এর মাঝেই। সেখানে থেকে ক্রোয়েশিয়ার এগিয়ে যাওয়া আর আমাদের পেছানো। আর বর্তমান অবস্থাটা তো সবারই জানা।

স্বাধীন দেশ হিসাবে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম অংশগ্রহণ ১৯৯৮ সালে। সেবারই তারা উঠেছিল সেমিফাইনালে। এরপর কেটেছে ২০টি বছর। এতদিন অপেক্ষার পর নিজেদের ইতিহাসের সোনালী যুগে এখন ক্রোয়াটরা। বর্তমান ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে এই ক্রোয়েশিয়াই ২০ নম্বরে থেকেও বিশ্বকাপের মতো আসরের মূল আলো কেড়েছে তারা। গ্রুপ পর্ব থেকেই দুর্দান্ত জয় নিয়ে নকআউটে উঠে। সেখান থেকে ডেনমার্ক, রাশিয়া এবং ইংল্যান্ড বাধা টপকে উঠেছে ফাইনালে। সোনালী স্বপ্নের শিরোপা থেকে আর মাত্র এক ধাপ দূরে ক্রোয়াটরা।

১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফুটবলের এই বিগ মঞ্চে ফ্রান্সকে হারাতে পারলেই শিরোপা ঘরে তুলবে মদ্রিচ-রাকিতিচরা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ব্রাজিল,আর্জেন্টিনা, জার্মানির পাশে বসবে ক্রোয়েশিয়া নামক একটি নতুন দেশ।

বাংলাদেশের সারিতে থাকা ১১৬তম দল ক্রোয়েশিয়াই আজ বিশ্বসেরা হওয়ার মঞ্চে খেলার অপেক্ষা করছে। আর সেখানে বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৯৪। আর মাত্র কয়েক ধাপ পেছালেই র‍্যাঙ্কিংয়ে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’! এত নিচে বাংলাদেশের ফুটবল আগে কখনো নামেনি! বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের র‌্যাঙ্কিং ১৩৮ থেকে ১৯৪ এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফুটবল। এরপর ১৯৭৪ সালে ফিফার সদস্যপদ লাভ করে। এশিয়া কাপে ১৯৮০ সালে মাত্র একবার অংশ নিতে পেরেছিল বাংলাদেশ। সেই আসরে অংশ নিয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের পর বাংলাদেশের ফুটবলে ২০০৩ সালের ‘সাফ চাম্পিয়নশিপ’ ও ২০১০ সালে ‘এসএ গেমস’ চ্যাম্পিয়ন ছাড়া আর তেমন কোনো সাফল্য নেই।

গত বছর এএফসি এশিয়া কাপ ২০১৯ এর বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে ভুটানের কাছে হারার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে প্রায় অবসরের পথে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের আগে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সম্ভাবনা নেই বাংলাদেশের সামনে। নিচু সারির দলগুলোকে নিয়ে ফিফার আয়োজিত সলিডারিটি কাপে নাম লিখিয়েও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বাফুফে। যার জন্য গুনতে হয়েছিল জরিমানা। রূপকথা বা গল্প নয়, এমন অবনমনের কাহিনীর জন্ম দিয়েই এগোচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ। আর এমন অন্ধকার থেকে লাল-সবুজরা কখনো আলোর পথে আসবে কিনা তা এখন ফুটবল সমর্থদের দেখার অপেক্ষা!

এই বিষয়ে সাবেক ফুটবলার শহিদ উদ্দিন আহমেদ সেলিমের সঙ্গে কথা বলা হলে ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘একটা সময়ে ক্রোয়েশিয়া আমাদের সারিতে থাকলেও এখন তাদের ফুটবলে অনেক অগ্রগতি। আর সেখানে আমাদের ফুটবল ব্যবস্থা পুরোই বিপরীত।

যখন সালাউদ্দিন ভাই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্বে আসেন তখন আমরা অনেক কিছু আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম বাংলাদেশের ফুটবল বুঝি আলোর পথে আসবে। কিন্তু তিনি আসার পর থেকে দেশের ফুটবল আরো অন্ধকারে। উন্নতি তো দূরে থাক দিনদিন আমরা ফুটবলে পিছিয়ে যাচ্ছি।

একটা সময়ে ভুটানের মতো দল আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারতো না। আর এখন সেই ভুটানের কাছেই আমরা চার-পাঁচ গোল খাচ্ছি। তাছাড়া বাংলাদেশের তো কোনো খেলোয়াড়ই তেমন নেই। এদেশে আমাদের সময় ছিল ফুটবলের জয়গান। সবাই ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতো সেই জায়গাটা এখন নিয়েছে ক্রিকেট। ফুটবল নিয়ে এখন আর কারো আগ্রহ নেই।’

বাংলাদেশে ভালো মানের খেলোয়াড় বা কোচ নেই বলে এমন ভাবে চলতে থাকলে দেশের ফুটবল শেষ হতে দেরি নেই বলেও তিনি মনে করেন। এই বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন,‘দেশে ভালো খেলোয়াড় নেই। ভালো কোচ নেই। কোনো খেলার আয়োজন করতে পাঁচটা টিমও গঠন করা যায় না। বোর্ড কর্মকর্তারা সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকেও এই বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের ফুটবল ১০০% ধ্বংস হবে। বোর্ড এই বিষয়ে যদি এভাবে চুপ করে থাকে তাহলে দেশের ফুটবল শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই।

আর ক্রোয়েশিয়ার দিকে তাকান। তারা একটা সময় আমাদের সারিতে থাকলেও এখন ঠিকই সাফল্যর পথে। তারা তাদের ফুটবল নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে এগোচ্ছে। অনেক টাকা খরচ করছে। দিনের পর দিন পরিশ্রম করছে। ভালো কোচ রাখছে। সেই জায়গায় আমরা কি করছি?’

সূত্র: ঢাকাটাইমস