চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে বিশ্বনবীর ভাষ্য : করণীয় ও বর্জনীয়

আমিন মুনশি: সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কুসংস্কার আছে। ওই সময় খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে, গর্ভবতী মায়েরা এ সময় যা করেন, তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে, চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় যদি গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করেন, তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হয় ইত্যাদি।

ইসলামি শরিয়া ও বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর কোনো মিল নেই। জাহেলি যুগেও এ ধরনের কিছু ধারণা ছিল। সেকালে মানুষ ধারণা করত যে চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ হলে অচিরেই দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষ হবে। চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ পৃথিবীতে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যুর বার্তাও বহন করে বলে তারা মনে করত। কিন্তু বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু, মহান সংস্কারক, হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেগুলোকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

হাদিস শরিফ থেকে জানা যায়, মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) বলেন- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিমের ইন্তিকালের দিনটিতেই সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তখন আমরা বলাবলি করছিলাম যে নবিপুত্রের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। এসব কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তায়ালার অগণিত নিদর্শন সমূহের দু’টি। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না।’ (সহিহ বুখারি : ১০৪৩)

চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে আল্লাহ তায়ালার কুদরত হিসেবে অভিহিত করে অন্য হদিসে নবীজি (সা.) সাহাবিদের চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনগুলোর দুটি। তোমরা সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি : ৯৮৪)

নবীজী (সা.)-এর হাদিসগুলো থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের কোনো প্রভাব সৃষ্টির ওপর পড়ে না। সমাজে প্রচলিত বিশ্বাসগুলো নিছকই কুসংস্কার।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি এর নেতিবাচক কোনো প্রভাব সৃষ্টির ওপর না-ই পড়বে, তাহলে কেন নবীজি (সা.) এ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার সাহায্য চাইতে বলেছেন? শুধু নামাজে দাঁড়াতেই বলেননি তিনি; বরং চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণে তিনি কিয়ামতের মহাপ্রলয়ের আশঙ্কাও করেছেন। হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন- নবীজি (সা.)-এর সময় সূর্যগ্রহণ হলে তিনি এ আশঙ্কা করলেন যে, কিয়ামতের মহাপ্রলয় বুঝি সংঘটিত হবে।

তিনি (তাড়াতাড়ি) মসজিদে এলেন। অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু, সিজদাসহ নামাজ আদায় করলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি নবীজি (সা.)-কে এমন করতে আগে আর কখনো দেখিনি। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রেরিত এসব নিদর্শন কারো মৃত্যু বা জন্মের (ক্ষতি করার) জন্য হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে, তখনই আতঙ্কিত হৃদয়ে আল্লাহ তায়ালার জিকির ও ইস্তিগফারে মশগুল হবে।’ (সহিহ মুসলিম : ১৯৮৯) অন্য হাদিসে চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে দ্রুত উদ্ধারে সদকা করার কথা বলেছেন।

আসুন, মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনধারাতে যখনই আমরা চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ দেখব তখনই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের মত ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত বাকবিত-ায় লিপ্ত না হয়ে বরং নামাজে দাঁড়িয়ে যাবো এবং আমাদের জীবনাচারে ইসলামের এ সংস্কৃতির চর্চা করবো।

সূত্র: আমাদের সময়।