ইউরোপ নয়, এটা বাংলাদেশ!

ছবিগুলো দেখে কতক্ষণ হতভম্ব হয়েছিলাম। এত সুন্দর! একদম প্রথমবার ছবিগুলো দেখে মনে হলো, এটা বুঝি ইউরোপের কোনো সেরা শহরের দৃশ্য, যে শহরগুলোর ছবি বুকে নিয়ে এক পাহাড় সমান স্বপ্ন দেখে যাই কবে যাব সেই শহরে! যে ছবি বুকে নিয়ে একরাশ হতাশায় ডুবে যাই কেন যে এমন কিছু আমাদের দেশে নেই, এই ভেবে!

সেই আক্ষেপ, হতাশা কিংবা স্বপ্নের বোঝাপোড়া চলতেই থাকে। মিল হয় না। এই ছবিগুলো দেখে প্রথমেই এত মুগ্ধতা ছুঁয়ে গেছে যে আফসোস হতে শুরু করেছিল, ইশ কোন দেশে না জানি এগুলো!

হতভম্ব হওয়ার মাত্রাটা বেড়ে গেল এবং এত গর্ব আর অদ্ভুত অহংকারবোধ শুরু হলো তখনই যখন শুনলাম ছবিগুলো আর কোথাও না, ইউরোপ না, অস্ট্রেলিয়া না, আমেরিকা, লন্ডন কিছুই না- এই ছবিগুলো বাংলাদেশের, হ্যাঁ সত্যি বলছি এটা আমারই দেশের ছবি!

বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেই চট্টগ্রামেই গড়ে তোলা হয়েছে এই অসহ্য রকমের সুন্দর পার্কটি। পার্কের নাম জাম্বুরি পার্ক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চট্টগ্রামে শিশু পার্কের পাশে প্রায় ৮ একর এলাকাজুড়ে এই জাম্বুরি পার্ক। আর পার্কটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি টাকা!

সন্ধ্যার পরই আগ্রাবাদ আলোকিত হয়ে যাবে এই পার্কের আলোক রোশনাইয়ে! সন্ধ্যার পরপর সাড়ে ৫০০ এলইডি বাতির আলোয় ঝলমল করবে এই জায়গা। বর্ণিল আলোতে ফুটে উঠবে দুটি ফোয়ারা। আপনি এই পার্কটিকে ‘বার্ডস আই’ ভিউতে দেখলে বিভ্রমে ডুবে যাবেন নিশ্চিত। অস্ফুট স্বরেই হয়ত আপনাআপনি বলে উঠবেন, এত সুন্দর কেন!

আড়াই হাজার ফুট দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা ৮ হাজার রানিং ফুটের ওয়াকওয়ের মাঝে সাড়ে ৩ ফুট গভীর ৫০ হাজার বর্গফুটের জলাধারের কিনারে বসার জন্য তিনটি দুই ধাপের গ্যালারি। মাঠজুড়ে ছোট ছোট সবুজের ঝোঁপ। মাঝখানে দুটি ছাউনি। মাঠের প্রান্তে বিশ্রামের জন্য স্থায়ী বেঞ্চ। ইট কাঠ পাথরের এই শহরে এমন অদ্ভুত সুন্দর জায়গা চট্টগ্রামবাসীর জন্য উপহার হয়ে এসেছে!

রোপণ করা হয়েছে ৬৫ প্রজাতির ১০ হাজার গাছের চারা। এর মধ্যে আছে সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাধাচূড়া, বকুল, শিউলি, সাইকাস, টগর, জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। খোলা চত্বরে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবুজ ঘাস। পার্কে বসার সুুযোগও রাখা হয়েছে। আর শুধু হাঁটার জন্য রাখা হয়েছে ৮ হাজার ফুট পথ।

পার্কে প্রবেশে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন বেঁধে দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকবে পার্ক। কিন্তু সেখানে খাবার নেওয়া যাবে না। জলাধারে গোসল করা যাবে না। গাছের ক্ষতি করা যাবে না।

এই পার্কটিকে ঢাকার রমনা পার্কের মতো ভাবা হচ্ছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পার্কটির উদ্ভোধনে গিয়ে বলেন, “এখানে অনেক গাছ লাগানো হয়েছে। এগুলো বড় হলে দেখবেন জাম্বুরি মাঠ রমনা পার্কের চেয়ে আরও সুন্দর লাগবে। এখানে চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়েছে। এটি গোসল করার জন্য নয়। পার্কে নির্মিত চৌবাচ্চায় গোসল করা যাবে না।”

পার্কটির পরিবেশ বজায় রাখতে অনুরোধ করেছেন দর্শনার্থীদের কাছে। তিনি বলেন, “আমরা এখানে হাঁটবো। আপনারা স্বাস্থ্যকর পরিবেশে হাঁটবেন। হয়তো অনেকে প্রেমিকাকে নিয়েও আসবেন। তাকে নিয়ে হাঁটবেন। প্রেমিকাকে নিয়ে হাঁটেন, কবিতা পড়েন, তাতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু বাদাম খাবেন না।”

এই অসম্ভব সুন্দর স্থাপনাটি আমাদের দেশের জন্য ভীষণ গর্বের। দেশের ইতিবাচক ব্র‍্যান্ডিং এবং ট্যুরিজমের স্বার্থে আমাদের স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের দেশে পার্কগুলো অল্পদিন পরেই অসামাজিক কাজের আখড়া হয়ে যায়। তার চেয়ে নোংরা ব্যাপার হলো, পার্কের এদিক সেদিক খাবারের বর্জ্য ফেলে মানুষ চলে যায়। অন্তত এই অদ্ভুত সুন্দর পার্কটির উপর মানুষের সেই বদ-অভ্যাসের আঁচড় না পড়ুক। আমরা যারা ঘুরতে যাবো, তারা দেশে বসে ইউরোপ মানের এই সৌন্দর্য যেমন তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করবো, তেমনি আমাদেরই খেয়াল রাখতে হবে আমাদের দ্বারা যেনো এই পার্কটির সৌন্দর্য হানি না ঘটে।

একসময় এই পার্কটি বলতে গেলে ময়লার ভাগাড় ছিল, পরিত্যক্ত যে জাম্বুরি মাঠে এই পার্কটি হয়েছে সেই পার্ক একসময় ছিল মশা, মাছি উৎপাদনের কারখানা। ঝোঁপঝাড়, জঙ্গলে ভর্তি ছিল এই মাঠ। ২০১৭ সালের শুরু থেকেই গণপূর্ত বিভাগের উদ্যোগে জাম্বুরি মাঠ উন্নয়ন এবং পার্ক নির্মানের কার্যক্রম শুরু হয়। তারপর একটি ঝোঁপঝাড়, জঙ্গল হয়ে উঠে আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন পার্ক!

দেশেই আমাদের ইউরোপের অনুভূতি নিয়ে আসা এই স্থাপনা অনন্য নজির হয়ে থাকলো আমাদের জন্য। চাইলে আমরাও যে পারি, শহরগুলোর রঙ বদলে দিতে, একটু উদ্যোগ, একটু ভাবনা, একটু ভালবাসা থাকলেই এমন সুন্দর কাজ হওয়া সম্ভব। ইউরোপের আবহ মনে এনে দেয়া এই অদ্ভুত সুন্দর নিয়ন আলোর উৎসবে মেতে থাকুক আজ আগ্রাবাদ। ভালবাসি প্রিয় বাংলাদেশ, ভালবাসি এমন সৌন্দর্য!