জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমুদ্রের বৈরী আচরণে ধ্বংস হচ্ছে কুয়াকাটার প্রকৃতি

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী: জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমুদ্রের বৈরী আচরণে ক্রমশই ধ্বংস হচ্ছে সাগরকণ্যা কুয়াকাটার প্রকৃতি। হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ বেষ্টনী ও প্রানী কূলের আশ্রয়স্থল। ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে নারিকেল বাগান। ধ্বংসের শেষপ্রান্তে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান ও লেম্বুরচর বাগাম। সৈকত জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এসব ধ্বংস যজ্ঞের চিহ্ন।

আগামী জো’তে বাকী অংশটুকুও সমুদ্রে তান্ডবে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃতির সবুজের সমাহার সৌন্দর্য এমন দৃশ্য দেখে হতাশ পর্যটক। উদ্বিগ্ন স্থায়ীনসহ বিনিয়োগকারীরা।

বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে বন বিভাগ অপার সৌন্দয়ের লীলাভুমি কুয়াকাটার সৈকত সংলগ্ন ১৫ হেক্টর জমিতে ঝাউ বাগান গড়ে তোলে। পর্যটকদের বিনোদনে এখানে গড়ে তোলা হয় পিকনিক স্পট, গোলঘর। নিরাপদ পানির ব্যবস্তা। যাতায়ত সুবিধায় নির্মান করা হয় সড়ক এবং বণাঞ্চলে প্রবাহিত খাল ও লেকের উপড় বেশ কয়েকটি দৃস্টি নন্দন সেতু। বক্স ও পাইপ কালভার্ট, গোল ঘর, জেটি, কার পার্কিং , পিকনিক সেড, টিকেট কাউন্টার, এপ্রোচ রোড, সিটিং বেঞ্চ, পুকুর ও বিদ্যুতায়ন সুবিধা।

বন্য প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়নে বাগান সৃজনসহ ৪৭ হেক্টর বাগানে অর্জুন, নিম, কদম, ছন, মান্দার, হিজল, বাঁশ, বট, সোনালু, আসাম লতা, স্বর্ণলতা, নারিকেল, তাল, খেজুর, আমলকি, উরিআম, পেয়ারা, গোলপাতাসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছ-গাছড়া। এক হাজার ৬শ’ ৬৭টি নারিকেল চারাও লাগান হয়েছে।

রয়েছে বানর, শুকর, সজারু, শিয়াল, বাদুর, কুকুর, বেজি, চামচিকা, গুইসাপ, কাঠবিড়ালী, অজগর সাপ, হলদে পাখি, বাবুই, পেঁচা, বউ কথা কও, চিল, শালিক, শ্যামা, টুনটুনি, ঘুঘু, মাছরাঙা, সাদাবক, ডাহুক, দোয়েল, বুলবুলি ইত্যাদিসহ অসংখ্য প্রজাতির বণ্যপ্রাণী রয়েছে। আইইউসিএন’র তালিকা অনুসারে এসব প্রজাতির অনেক বণ্যপ্রাণী বিরল ও বিলুপ্ত প্রাায় প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

প্রকৃতি প্রেমী পর্যটকদের অগ্রহ বিবেচনায় ২০১০ সালে (২৪ অক্টোবর) উদ্ভিদ, বন্য প্রাণী, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধ উন্নয়নের লক্ষ্যে ঝাউবনসহ ১৬১৩ হেক্টর বনাঞ্চলকে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে সরকার। এর অদূরেই রয়েছে বিশাল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গঙ্গামতি চর।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে আন্ধারমানিক নদ ও সাগরের মিলন মোহনার লেম্বুর চরে বন বিভাগের একটি বাগান রয়েছে। এখানেও রয়েছে কড়াই, গেওয়া, ছৈলা ও কেওড়া গাছ। বেড়াতে আসা পর্যটকরা এখানে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেরিবাঁধ থেকে উদ্যানের যাওয়ার মূল সড়কটি হয়ে পড়েছে চলাচলের অনুপযোগী। শুধু নাম সর্বস্ব সাইন বোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুয়াকাটার জাতীয় উদ্যানটি। সমুদ্রে অস্বাভাবিক জোয়ারের বিশাল বিশাল ঢেউ আঁচড়ে পড়ছে বাগানে। জোয়ারের সময় উদ্যানের আধিকাংশ প্লাবিত হয়ে যায়। তীব্র এ ঢেউয়ের ঝাপটায় অসংখ্য গাছ উপড়ে পরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সৈকতে।

গঙ্গামতির সৈকতে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার পথে পর্যটকরা প্রতিনিয়ত এসব গাছে আহত হচ্ছে। এক সময়ের দৃষ্টিনন্দন লেকটি পরিণত হয়েছে কচুরিপানায় ভর্তি বদ্ধ জলাশয়ে। বর্ণিল পাতাবাহার গাছগুলো নেই। রং বে-রংয়ের ফুলেরসহ ফলের অনেক গাছের চিহ্ন এখন আর নেই। উদ্যাটির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা লেকটির উপর নির্মিত কাঠের ব্রিজটির কঙ্কালের এক সময়ে অস্থিত্বের স্বাক্ষ্য বহন করছে। হদিস নেই ৬টি প্যাডেল বোটের।

পিকনিক পার্টির টিনের ছাউনির ঘরের স্মৃতি চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। পর্যটক ও দর্শনার্থীরা এখন বাগানের ভিতরে যেতে পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যতটুক অস্থিত্ব টিকে আছে সেখানেও বিরাজ করছে ভূতুরে পরিবেশে।

স্থানীয়রা জানান, সমুদ্রের কোল ঘেষে গড়ে তোল ঝাউ গাছসহ নানা প্রজাতির বনজ, ফুলজ ও ফলজ গাছের সৌন্দর্যমন্ডিত জাতীয় উদ্যান পর্যটকদের জন্য হয়ে ওঠে অন্যতম বিনোদনের পার্ক। সিডর, আইলা ও মহাসেনের মতো সুপার সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসে কয়েকদফা বিধ্বস্ত হয়েছে এ জাতীয় উদ্যানটি।

সম্প্রতি বেশ কয়েকবার সমুদ্রের অস্বভাবিক জোয়ারের ঢেউয়ের ঝাপটায় ঝাউ বাগানের শত শত গাছ উপড়ে পড়েছে সৈকতে। উদ্যানের ৭০ শতাংশ ঝাউ গাছ বিলিন হয়ে গেছে। বর্তমানে এ উদ্যানটি ভূতরে পরিবেশে পরিনত হয়েছে।

পর্যটক ইকবাল করিম জানান, ইকোপার্কের মধ্যে কাঠের ব্রিজগুলো একেবারেই ভাঙ্গাচোরা। বৃষ্টি সময় কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই। সমুদ্র শাসন বা প্রটেকশন না থাকায় ঢেউয়ের তান্ডবে সৈকতের বালু সরে গিয়ে গাছ গুলো উপড়ে পড়ছে। ক্রমশই সৌন্দর্য ও অস্থিত্ব হারাচ্ছে উদ্যানটি।

বনবিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য বর্ধনসহ উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি খুব শ্রীঘ্রই এর কাজ শুরু হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।