থাইরয়েড রোগ কী, এর লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়, দেখে নিন

হরমোন নিঃসরনকারী গ্রন্থির মধ্যে থাইরয়েড একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। ইহা গলার সন্মুখভাগে ত্বক ও মাংশের গভীরে অবস্থান করলেও এ গ্রন্থিটির আকার বড় হলে গলগন্ড নামক রোগ হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ঘ্যাগও বলা হয়ে থাকে।

এই গ্রন্থিনিঃসৃত হরমোন শরীরের সমস্ত বিপাক প্রক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে বিধায় চিকিত্সা বিজ্ঞানে এর গুরুত্ব অপরিসীম। থাইরয়েডজনিত রোগীর সংখ্যাও অনেক। চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের দেশেও থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সায় ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে।

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সাধারণত দুই ধরণের সমস্যা দেখা যায়, গঠনগত ও কার্যগত। গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় যেটাকে গয়টার বল হয়। কার্যগত সমস্যা দুই রকমের হয়ে থাকে তা হল হাইপারথাইরয়ডিজম ও হাইপোথাইরয়ডিজম। হাইপারথাইরয়ডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে ও হাইপোথাইরয়ডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ করে না।

থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার কারণ:- হাইপোথাইরয়ডিজম মূলত তিনটি কারণে দেখা যায়। নবজাতক শিশুদের মধ্যে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড তৈরি না হলে কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়। এছাড়া অটোইমিউন হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি সক্রিয় হলে হাইপোথাইরয়ডিজম নষ্ট হয়ে যায়। তখন থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ করেনা। চিকিৎসাজনিত কারণেও এই অসুখ হতে পারে। অপারেশনের কারণে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বাদ দিতে হলে বা অন্য কারণেও থাইরয়েড নষ্ট হয়ে গেলে এই সমস্যা হতে পারে।

অ্যান্টিবডি অতিরিক্ত মাত্রায় থাইরয়েডকে স্টিমুলেট করলে হাইপারথাইরয়ডিজমের সমস্যা দেখা দেয়। চূড়ান্ত পর্যায়ের পর ওষুধ এর ডোজ বেশি হলে তার থেকে হাইপারথাইরয়ডিজম হতে পারে। থাইরয়ডাইটিসে রক্তে থাইরয়েডের মাত্রা বেড়ে যায়।

যেসব অঞ্চলে আয়োডিনের অভাব রয়েছে সেখানে আয়োডিনের অভাব জনিত কারণে হাইপোথাইরয়ডিজম দেখা যায়।
হাইপোথাইরয়ডিজমে যে লক্ষনগুলো দেখা দেয়:–

অবসাদগ্রস্থ হওয়া, সাথে অলসতা, ঘুম, ঘুম ভাব। ত্বক খসখসে হয়ে যায়। পা অল্প ফুলে যায়। ক্ষুধা মন্দা শুরু হয়। চুল পড়তে শুরু করে। ওজন অল্প বেড়ে যায়, ৫-৬ কিলো বেড়ে যেতে পারে। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়। ব্লাড প্রেশার বাড়তে পারে। বন্ধ্যাত্বর সমস্যা হতে পারে। গর্ভধারণকালে গর্ভপাত হতে পারে। কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়ডিজমে শিশুর ব্রেনের বিকাশ হয়না।

শীত শীত ভাব দেখা যায়। পিরিয়ডের সমস্যা হতে পারে। হাইপারথাইরয়ডিজমে যে সমস্যা দেখা দেয়:- ক্ষুধা বেড়ে গেলেও ওজন কমতে থাকে। প্রচন্ড গরম লাগে। বুক ধড়ফড় করে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। পিরিয়ডের সমস্যা দেখা দেয়। ত্বক কালো হয়ে যায়।
হার্টের সমস্যা হতে পারে। ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়। হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসে। হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা শুরু হয়। বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।

থাইরয়েড এর এই সমস্যা গুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করা যায়। যেমন – বেশি করে ভিটামিন এ গ্রহণ করতে হবে: থাইরয়েড এর সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হল বেশি বেশি ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। এর জন্য প্রচুর গাজর, হলুদ ও গাঢ় সবুজ শাকসবজি ও ডিম খেতে হবে। নারিকেল তেল: নারিকেল তেলে যে ফ্যাটি এসিড আছে তা থাইরয়েড এর কাজকে ত্বরান্বিত করে, এছাড়াও বিপাকে সহায়তা করে ও এনার্জি প্রদান করে।

এটা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে যা হাইপো থাইরয়েডিজম এর রোগী দের জন্য ভালো। – রান্নার জন্য এক্সট্রা ভার্জিন অর্গানিক নারিকেল তেল ব্যবহার করুন। – সকালের নাস্তার সময় দুধের সাথে ২ চামচ নারিকেল তেল মিশিয়ে খেতে পারেন। আপেল সাইডার ভিনেগার: থাইরয়েড-এর সমস্যায় আপেল সিডার ভিনেগার অনেক কার্যকরী। এটা এসিড ও ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করে, শরীর কে বিষ মুক্ত করে, ওজন কমতে সাহায্য করে এবং হরমোনের নিঃসরণে সহায়তা করে।

১ গ্লাস উষ্ণ পানিতে ২ চামচ অর্গানিক আপেল সাইডার ভিনেগার মিশান – এর সাথে কিছুটা মধু যোগ করুন – এই মিশ্রণটি প্রতিদিন খাওয়ার চেষ্টা করুন, টিপস: আপনার খাদ্য তালিকায় বাদাম, শিমের বীজ, পনির সহ প্রচুর ফল ও শাকসবজি রাখুন, প্রতিদিন কিছু সময় ব্যায়াম করুন বা আপনার শারীরিক কার্যক্রম বাড়িয়ে দিন।এর ফলে শরীরে এমনকি থাইরয়েড গ্রন্থিতে অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন- পেঁয়াজ, ভুট্টা, আনারস, টমেটো, রসূন, বাঁধাকপি ও স্ট্রবেরি খান !

অনেক পানি পান করুন, হাই ক্যালরি যুক্ত খাবার বর্জন করুন। ভাঁজা পোড়া খাবার কম খান, বেশি করে খনিজ লবণ সমৃদ্ধ খাবার খান, ভিটামিন ডি গ্রহণ করুন, কার্বোহাইড্রেট কম গ্রহণ করুন, যদি থাইরয়েড গ্রন্থিতে ব্যাথা হয় ও ফুলে যায় তাহলে দ্রুত ডাক্তার দেখান।