প্রেমিকার জন্য আট বছরের অপেক্ষা!

আপনি কি কখনো আপনার প্রেমিকার জন্য ৮ বছর অপেক্ষা করতে পারবেন? যেখানে আপনার প্রেমিকার সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো নিশ্চয়তাই নেই? ঠিক এমনটিই করেছিলেন এক জাপানি ভদ্রলোক নিশিজাওয়া। জাপানি দম্পতি হিশাশি নিশিজাওয়া এবং মাই নাকাহারা ২০০৭ সালে বিয়ের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে সাত বছর অপেক্ষা করে ২০১৪ সালে বিয়ের পিড়িতে বসতে সক্ষম হন তারা।

প্রাথমিকভাবে ২০০৭ সালের শুরুতে তাদের বিয়ের সময় নির্ধারিত হলেও দুঃখজনক এক ঘটনায় বর নিশিজাওয়া, ক্রিসমাসের তিন মাস আগে সমস্ত পরিকল্পনার ইতি টানেন। ২০০৬ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে নববধূ নাকাহারা তার স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন এবং এক রাতে তার কন্ঠ দিয়ে অদ্ভুত ধরণের শব্দ বের হতে থাকে। তার অবস্থা সনাক্তকরণ, স্মৃতিজনিত ক্ষতি এবং অদ্ভুত আচরণের কারণ জানতে নিউরোসার্জারী বিভাগ তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দেয়।

হাসপাতালে ভর্তির সময়, তার হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুস সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়ার ফলে সে কোমায় চলে যায়। এরপর আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে ওকায়ামা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেসময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই নিয়ে শিরোনাম হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময়, নাকাহারার বাবা-মা, নিশিযাওয়াকে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করার কথা বললে সে বলেছিল, “আমি অপেক্ষা করব।”

কয়েক মাস পর, চিকিৎসকরা বললেন, নাকাহারা এন্টি-এনএমডিএ রিসেপ্টর এনসেফালাইটিস নামক রোগে ভুগছে। রোগটি মস্তিষ্কের ফাংশন আক্রমণের জন্য ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয় যার ফলে ব্যাকটেরিয়া মস্তিষ্কে সহজে আক্রমণ করতে পারে।এটি একটি বিরল রোগ, যা প্রতি মিলিয়নে শূণ্য দশমিক ৩৩ জন মানুষের হতে পারে।

এই রোগে হ্যালুসিনেশন, শ্বাসকষ্ট এবং অপরের সঙ্গে যোগাযোগে অক্ষমতা দেখা দেয়। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। নিশিযাওয়া একটি মটর গ্যারেজে কাজ করতো, সেখান থেকে প্রতিদিন কাজ সেরে নাকাহারাকে দেখতে যেতো। মটর গ্যারেজ থেকে দু’ঘন্টার দূরত্বে ঐ হাসপাতালে প্রতিদিন সে নাকাহারাকে দেখতে যেত, যে কিনা অজ্ঞান অবস্থায় বেডেই পরে থাকত। তখন নিশিযাওয়া তার ছবি তুলতো, ভিডিও করতো এবং বলতো “দ্রুত সুস্থ হও”।

ঘুমন্ত অবস্থায় তোলা ছবি ও ভিডিওগুলো সে নাকাহারা’র মোবাইল ফোনে সেন্ড করতো। চিকিৎসার কয়েক বছরের মধ্যেই নাকহারা কণ্ঠস্বরে ও অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তায় উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। কয়েক বছর ধরে এবং ধীরে ধীরে নাকাহারা তার কিছু হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে শুরু করে। ২০১১ সালের দিকে নাকাহারা তার আবেগ প্রকাশ করতে সক্ষম হয় এবং এমনকি তার নাম কানজি অক্ষরে লিখে দেখান।

পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে তার অবস্থার উন্নতি ঘটতে লাগলে নাকাহারা তার পরিবারের সদস্যদের চিনতে শুরু করে। একে একে সকলকে স্মরণ করতে পারলেও একজন ব্যক্তিকে সে স্মরণ করতে পারেনি, তিনি হচ্ছেন নিশিযাওয়া। যে কি না তার হবু বর! তবুও নিশিযাওয়া হাল ছাড়েন নি! নিশিযাওয়া সবসময়ই তার পাশে ছিলেন। মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে নাকাহারা বলতো কেন লোকটা সবসময় আশেপাশে থাকতো!

“বিবাহের অনুষ্ঠান” এবং ১১ ই মার্চ, ২০০৭ তারিখে লেখা একটি পুরাতন পকেটবুক দেখার পরে নাকাহারা তার হারানো স্মৃতি ফিরে পায়। নাকাহারা অবশেষে বুঝতে পেরেছিল নিশিজাওয়া তার জীবনে আসলে কে? । কারণ পকেটবুকে থাকা বিভিন্ন তারিখে লেখা নোট এবং নাকাহারার ফোনে থাকা দু’জনের অসংখ্য ছবি দেখেছিলো। ২০১৪ সালের জুনে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি আটকে থাকার প্রায় আট বছর পর, এই জুটি বিয়ের পিড়িতে বসেন।

২২শে ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে বিয়ের অনুষ্ঠানটি ঘটে যেখানে তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এবং নাকাহারের যত্ন নেয়া ওয়াকামা হাসপাতালের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের পর তাদের একটি সন্তানও হয়। অবিশ্বাস্য এই প্রেমের গল্প সারা বিশ্ব জুড়ে মানুষের মনমোহন করেছে, জাপানি টিভিতে তাদের সাক্ষাৎকার দেখানো হয়েছে। এই গল্পে একটি বই এবং এমনকি ‘দ্য এইট-ইয়ার এঙ্গেজমেন্ট’ নামক চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে।