মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখাই ধর্ম : মালিহা রশীদ

ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলা। ছোট বাসায় ছোট মালিহা দেখতেন— বাবা সব রোগের চিকিৎসা দিতে পারেন, পারেন না কেবল প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা দিতে। তখন তার মনে হতো, সবার আগে মায়েদের সেবা দিতে হবে। তখন থেকেই চিকিৎসক হতে চেয়েছেন।

সেই ছোটবেলার ইচ্ছা থেকেই পরবর্তী জীবনে মালিহাকে প্রসূতিবিদ্যার অন্যতম চিকিৎসক অধ্যাপক মালিহা রশীদে পরিণত করেছে। সেন্ট্রাল হাসপাতালে বসে নিজের চেম্বারে বসে একান্ত আলাপকালে নিজের ক্যারিয়ারের কথা বলছিলেন এই চিকিৎসক। বলছিলেন, ‘একজন চিকিৎসকের প্রধান ধর্ম হওয়া উচিত মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখা। তবেই রোগ নির্ণয় ও তার যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব।’

নস্টালজিক শৈশব বারবার পিছু ডাকে

মালিহা রশীদ বলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে ভাঙ্গা উপজেলায়। ভাঙ্গা স্কুলের বর্তমান নাম কে এম (কাজী মাহবুবুল্লাহ) হাই স্কুল। আরেকটি স্কুল ছিল কালীবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু আমরা সব ভাই-বোন কালীবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়তাম। এটা ১৯৬৭, ৬৮ ও ৬৯ সালের কথা।

তিনি ফরিদপুর জেলার মানুষ

শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. মালিহা রশীদ বলেন, ‘স্কুলের কথা মনে হলেই শাহ আব্দুল করিমের সেই গান মনে পড়ে— আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। কালীবাড়িতে যখন পূজা হতো, সবাই মিলে নতুন কাপড় পরতাম, আাবার ঈদের জন্য সবাই মিলে অপেক্ষা করতাম, সবাই সকাল বেলায় আমাদের বাসায় আসতো। একসঙ্গে খেয়ে ঘুরতে বেরুতাম। তখন খুব সুন্দর পরিবেশ ছিল। এখন এটা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়।’

মালিহা রশিদ বলেন, ‘প্রাইমারি শেষ করে চলে এলাম ভাঙ্গা হাই স্কুলে। সে স্কুলে ছেলে-মেয়ের শিফট আলাদা ছিল।

আমাদের সেকশনে সায়েন্স বিভাগ ছিল না। । চার থেকে পাঁচটি লেটার মার্কস পেয়েছিলাম। কিন্তু ছেলেদের সঙ্গে পড়া হয়েনি, নিজে নিজে বাসায় পড়েছি। বাসায় গৃহশিসায়েন্স পড়তে হলে ছেলেদের সঙ্গে পড়তে হতো। আমিই প্রথম ছিলাম, যে ভাঙ্গা স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়েছিলামক্ষক ছিলেন। স্কুলে আমি বিজ্ঞানের কোনও ক্লাস করিনি।’

বাবা চিকিৎসক ছিলেন উল্লেখ করে মালিহা রশীদ বলেন, ‘ভাঙ্গায় তিনি খুব বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। বাবার ইচ্ছে ছিল ঢাকায় পড়তে আসি। ৮ ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। তারা এখনও প্রত্যেকে প্রতিষ্ঠিত, কেউ চিকিৎসক, কেউ স্থপতি। বিদেশে বাংলাদেশি হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তবে হারিয়েছি এক ভাইকেও। টাইফয়েডে হয়ে ভাইটি মারা গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আব্বা তো চিকিৎসক ছিলেন, তিনি বুঝতেও পারছিলেন। কিন্তু গ্রামে থাকতাম, টাকা পয়সাও ছিল না, চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। পরে তাকে নিয়ে আসা হয়, কিন্তু তখন সেটা ছিল লাস্ট স্টেজ।’

চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়ার প্রসঙ্গ টেনে মালিহা বলেন, ’৭৮ সালে বাবা ফরিদপুরের কমলাপুরে স্থায়ীভাবে চলে আসেন। ওই বছরই মিটর্ফোড মেডিকেল কলেজে চান্স পাই।’

ওই সময়ে পরিবারের বড় মেয়ে বাড়ি থেকে লেখাপড়া করতে ঢাকায় চলে এলেন। কোনও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন কি না— জানতে চাইলে মালিহা রশীদ বলেন, ‘আমার মা বড় হয়েছেন কলকাতায়, বড় মামা প্রেসিডেন্সি কলেজে লেখাপড়া করেছেন। তিনি দ্বিতীয় মুসলিম পিএইচডি হোল্ডার ছিলেন। আমরা ভাঙ্গায় থাকতাম, কিন্তু জীবনটা সে রকম ছিল না। বাবা চিকিৎসক ছিলেন, মা-মামারা শিক্ষিত ছিলেন। ঢাকায় থাকতেন আমার বাবার বন্ধু শামসুদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন আমার ঢাকায় স্থানীয় অভিভাবক।

এই চাচা ও চাচির যে আন্তরিকতা আমার প্রতি ছিল, তার প্রতিদান আমি কোনোদিন দিতে পরিনি, পারবোও না। আমি হোস্টেলে থাকতাম, কিন্তু বিভিন্ন ছুটিতে প্রথমদিকে আমি সে বাসায় এসে থাকতাম। পরে লেখাপড়ার চাপ বেড়ে যাওয়ায় আর আসা হতো না।’

মালিহা রশীদ বলেন, ‘এই চাচী দুধের মগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। হোস্টেলে ফিরে আসার সময় টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার দিয়ে দিতেন। আমার মায়ের পরে এই চাচীকে আমি বেশি ভালোবাসতাম।’

অধ্যাপক মালিহা রশীদ যখন তিততিল

আজকের নামি অধ্যাপক ডা মালিহা রশীদ ছোট ভাইবোনদের কাছে ছিলেন তিততিল। তিনি বলেন, ‘আমি ফুলবাড়িয়া থেকে সূর্যমুখী বাসে উঠে যেতাম সাড়ে ৩টায়। সাড়ে ৬টার মধ্যে বাড়ি থাকতাম। আসলে আমি খুব ‘ঘরের মেয়ে’ ছিলাম।

অমি অনেক অনুষ্ঠান মিস করেছি, শিক্ষাজীবনে বন্ধুত্ব যে হয়, সেটা আমার তখন হয়নি। বন্ধুরা যখন গল্প করে, আড্ডা দেয়, ওই সময় আমি থাকতাম না। চলে যেতাম ছোট ভাই-বোনদের কাছে। লাবনী আর সিঞ্জনের জন্য আমি কিছুতেই ঢাকায় থাকতে পারতাম না।

ছোট ভাইটা আমার পড়ার সঙ্গী ছিল, হাড়-গোড়, মাংসের নাম ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতাম, পড়তাম আর ভাইটাকে বলতাম, তুমি কী বুঝেছো? এইভাবে আমি পড়তাম। আম্মা বলতেন, আমি তো বাসা থেকে যেদিন ঢাকা চলে আসতাম, সেদিন ওরা স্কুল থেকে এসে আমাকে না দেখে যেভাবে হাত পা ছুড়ে কাঁদতে শুরু করতো। কেন তুমি তিততিলকে ঢাকায় পড়তে যেতে দিলা। ভাইবোনরা আমাকে তিততিল বলে ডাকতো।’

এই নাম কেন—জানতে চাইলে মালিহা রশীদ বলেন, ‘ভাইবোনদের দিদি বলে ডাকতে শেখালেও যে ভাইটা মারা গিয়েছে, সে দিদি বলতে পারতো না। বলতো তিততিল। সেটাই পরে সবাই ডাকা শুরু করে।’

স্ট্যান্ড করিনি, কিন্তু কখনো ফেলও করিনি

একপ্রশ্নে জবাবে মালিহা রশীদ বলেন, ‘একদিন আমি এমবিবিএস পাস করে গেলাম। তবে, কখনো স্ট্যান্ড করেছি তা নয়, কিন্তু কখনো ফেলও করিনি। আর ভালো করার সুযোগ ছিল না। কারণ আমি খুব হোম সিক ছিলাম, খুব হোমসিক।

যেকোনো ছুটিতে আমি বাড়ি ছুটতাম। পাস করে যাওয়ার পর গাইনি বিভাগের সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে তখন গাইনি, মেডিসিন, সার্জারিসহ সব বিভাগে সব প্রথিতযশা অধ্যাপক ছিলেন। আমরা খুব ভালো পরিবেশে লেখাপড়া করেছি।’

মালিহা রশীদ বলেন, ‘সার্জারির অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমান আমার শিক্ষক ছিলেন। এখন ‍তিনি এই হাসপাতালে আমার উল্টো দিকের কক্ষেই বসেন। তিনি আমাকে বলেন, আই অ্যাম সো প্রাউড অব ইউ। তোমার জন্য রোগীরা বসে থাকে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য এটা অনেক গর্বের। শিক্ষকের মুখে এই কথা শুনে কার না গর্ব হয়!’ তিনি আরও বলেন, ‘সার্জারির অধ্যাপক এটি সিদ্দিকী, মেডিসিনে ছিলেন অধ্যাপক ওয়ালিউল্লাহ, গাইনি বিভাগের অধ্যাপক সুরাইয়া জাবীন, সুরাইয়া খাতুন, নীলুফার আফতাভীর মতো শিক্ষকদের আমরা পেয়েছি। আমার আইডল ছিলেন সুরাইয়া জাবীন। তার প্রতিটি বিষয় আমাকে আকর্ষণ করত। তাকে দেখেই আমি গাইনি বিষয়ে পড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেই।’

নিজের ওপর ভরসা থাকতো না

মেডিকেল পরীক্ষার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মালিহা রশীদ বলেন, ‘মেডিকেল ফাইনাল পরীক্ষার আগে একদিন আব্বা এলেন। কারণ, আমি ভয় পাই, খাওয়া দাওয়া ভুলে যাই, পড়া ভুলে যাই, বাড়ির কথা মনে হয়। আমার নিজের ওপর কোনো ভরসা থাকে না, মনে হতো পরীক্ষায় ফেল করবো। আব্বা সেদিন আমাকে খুব বোঝালেন। তখন রাউন্ডে যাচ্ছিলেন ডা. সুরাইয়া জাবীন। আমাদের দেখে দাঁড়ালেন, বললেন, তুমি ভয় পাচ্ছে কেন, তুমি ভালো করবে। এই যে কথাটা, ইট ওয়াজ অ্যা বুস্টিং ফর মি। আমিও অন্য সব পরীক্ষার চেয়ে সেই পরীক্ষায় ভালো করলাম। পরে তার অধীনেই ইন্টার্ন করলাম।

একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মালিহা তুমি কী হবে? বললাম, আপনার অ্যাসিসটেন্ট রেজিস্টার হবো। আমার দৌড় ওইটুকুই ছিল। কখনো অধ্যাপক সুরাইয়া জাবীন হব, সেটা চিন্তাতেও ছিল না। আমি তার ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট (সিএ) হিসেবেই নিজেকে ভাবতাম।

তিনি বলতেন, তুমি আমার সিএ হবে কিন্তু তোমাকে পার্ট ওয়ান পাস করতে হবে। এই আমাকে নেশা পেয়ে বসল।’

পার্ট ওয়ান পাস করার প্রসঙ্গ টেনে উচ্ছ্বল হাসিতে মেতে ওঠেন এই অধ্যাপক চিকিৎসক। বলেন, ‘তিনিই ছিলেন মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রথম গাইনোকলোজিস্ট। আমি কলেজের ষষ্ঠ ব্যাচ, কিন্তু সবার আগে এফসিপিএস করি।’

সব দায়িত্ব পালন করতে হয় একজন নারীকে

দাম্পত্য জীবনের প্রসঙ্গ টেনে মালিহা রশীদ বলেন, ‘তারপর ডা. শাহাদাত হোসনের সঙ্গে বিয়ে হলো। বিয়ের পরে আমি কিছুদিন বরিশাল চলে গেলাম। মেয়ের জন্ম হলো। একজন মেয়েকে পরিবারের সবকিছুতে নিয়োজিত থাকতে হয়। একজন কর্মজীবী নারীকে সংসার, সন্তান, স্বামী, ক্যারিয়ার—সবই সামলাতে হয়। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পর আবার মিটফোর্ডে গেলাম। সকাল-দুপুর-রাতে কাজ করতে হতো। দ্বিতীয় সন্তানকে পেটে নিয়ে সারারাত জেগে অস্ত্রোপচার করতাম। অথচ আমি একজন অধ্যাপক, চিকিৎসক, সার্জন, স্ত্রী, মা, সংসারের বড় মেয়ে। সব দায়িত্ব পালন করতে হয় একজন নারীকে।

চিকিৎসা পেশায় ভুলের অবকাশ নেই

চিকিৎসকের পেশা এমন এক পেশা, যেখানে কোনো ভুলের অবকাশ নেই বলে মন্তব্য করেন মালিহা রশীদ। তিনি বলেন, ‘এখানে মানুষের জীবন নিয়ে কাজ। অনেক ভালো কাজ করার পরও ভুলবশত নয়, কোনো অবহেলার কারণেও নয়, নিজের অজান্তে যদি কিছু হয় তাহলেও ক্ষমা নেই। কিন্তু আমরাও মানুষ। ডাক্তারকে কেউ মানুষ হিসেবে ভাবে না। আমি মাঝে মধ্যে বলি, ডাক্তাররা মানুষ না, দেবতাও না। তাহলে কি তাদের আলাদা সমাজ? উন্নত বিশ্বে রেফারেল পদ্ধতিতে চিকিৎসা হয়। চিকিৎসকদের কেউ সেখানে অমানুষ বলে গালি দিতে পারে না। অথচ চিকিৎসকদের রিলিফের জন্য এই রেফারেল পদ্ধতি দরকার। আমরাও মানুষ।’

ক্যারিয়ার

মালিহা রশীদ সহকারী অধ্যাপক হন ৩০ থেকে ৩২ বছর বয়সে। তিনি বলেন, ‘এত কম বয়সে এটা খুব টাফ আমাদের জন্য। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম ১৯৯৩ থেকে ৯৮ সাল পর্যন্ত। তারপর আবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে গেলাম। ২০০২ সালের সহযোগী অধ্যাপক হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এলাম। এরপর ২০০৫ সালে অধ্যাপক। ২০০৭ সালে বিভাগীয় প্রধান।’ এখন দেশের অন্যতম সেরা একজন গাইনি চিকিৎসক হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সেন্ট্রাল হসপিটালে।

পাঁচ তারকা হাসপাতালে গিয়ে শান্তি পাইনি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর এই চিকিৎসক যোগ দেন প্রথম সারির একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আমি এলিট শ্রেণির চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছি। যা আমি কখনোই চাইনি। সে হাসপাতালে আমি অস্ত্রোপচার করে আমার ফিটুকু-ও ফ্রি করতে পারিনি একজন চিকিৎসক মেয়ের জন্য।’ তিনি বলেন, ‘যখন বুঝতে পারলাম দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত মানুষের সেবা করার সুযোগ নেই, তখনই ফিরে এলাম সেন্ট্রাল হাসপাতালে। এখানে সব ধরনের স্বাধীনতা পেয়েছি।’

মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখাই ধর্ম

চিকিৎসা সেবার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মালিহা রশীদ বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে থাকার সময়ে রোগীদের মুখে শুনতাম, এই হাসপাতালে নাকি সেই ডাক্তার আছে, যিনি একইসঙ্গে মিটর্ফোড হাসপাতালেও রোগী দেখতেন। কথাটা শুনতাম রাউন্ড দেওয়ার সময়। রোগীরা গল্প করতেন, শুনতাম। বুঝতাম, রোগীরা আমাকে ভালোবাসেন। আমি সবসময় মনোযোগ দিয়েই রোগী দেখি। তাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। আসলে ডাক্তারের ধর্মই হলো মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখা।’ কাজের জন্য সততা ও আন্তরিকতা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।