ছাত্ররা কেন ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় ?

কাঁটাবন থেকে হাতিরপুল সড়ক হয়ে গ্রীন রোড যাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নজরুল ইসলাম। বাহন ১০০ সিসি পুরনো হোন্ডা মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো হ ১৯-৬১৬৬)। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট। এ সময় তার গতি রোধ করে ইউনিফরম পরা এক স্কুলছাত্রের সম্বোধন ‘স্যার আসসালামু আলাইকুম, আপনার গাড়ির কাগজগুলো দেখান।’কাগজপত্র সব ঠিকঠাক রয়েছে দাবি করে কিছুই দেখাতে রাজি হননি হেলমেটবিহীন নজরুল ইসলাম। এর পর বাগ্বিত-া। মুহূর্তেই এসে জড়ো হয় ১৬-১৮ বছর বয়সী আরও কয়েকজন ছাত্র।

বাধ্য হয়ে একপর্যায়ে কাগজপত্র দেখাতে বাধ্য হন মোটরসাইকেল আরোহী। ছাত্রদের চোখে ধরা পড়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তবে ২০১১ সালের ২২ মার্চে তার মেয়াদোত্তীর্ণ। তাৎক্ষণিক ট্রাফিক পুলিশ ডেকে আনে ছাত্ররা। চালক নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এপিএসের ঘনিষ্ঠ লোক দাবি করলেও সবশেষে ৪০০ টাকার মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।এভাবে বৃহস্পতিবার দিনভর ঢাকার পথে পথে বাস, মোটরসাইকেল, সিলভার রঙের প্রাইভেট সিএনজি-অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

কাগজপত্র না থাকা কিংবা প্রাইভেট সিএনজি-অটোরিকশায় অবৈধভাবে যাত্রী বহনের ঘটনা ঘটলেই পুলিশের হাতে সেসব গাড়ি তুলে দেওয়া হয়। পুলিশও ছাত্রদের কথামতো মামলা দেয়। আবার রাস্তার লেন বিভাজনে যেভাবে গাড়ি চলার কথা, রং পথে গাড়ি চলা, জেব্রা ক্রসিং অতিক্রমসহ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের শাস্তি দিতে দেখা গেছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এদের অধিকাংশকেই শিশু হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু হঠাৎ করে শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে কেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক দলের একটি প্রভাবশালী চক্রÑ হোক আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি-জামায়াত জোট। সব সময়ই এরা রূপ বদলে গিয়ে একাধারে সড়কপথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অদক্ষ চালক ও অনুমোদনহীন গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে যুগের পর যুগ ধরে এসব গাড়ি চলাচলে ট্রাফিক পুলিশের মৌন সমর্থন রয়েছে। ঘুষ আদায়ের কারণে এসব গাড়ি রাস্তায় চলতে পুলিশ সহায়তা করে আসছে। ফলে ঢাকার রাস্তায় চলছে পরিবহন নৈরাজ্য।

এ অবস্থায় ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমে আসে। জনসাধারণ তাৎক্ষণিক এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও ভবিষ্যৎ পরিণতি মঙ্গলজনক নয় বলে মনে করছেন সমাজচিন্তকরা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা আমাদের সময়কে বলেন, রাস্তায় নেমে শিশুরা ট্রাফিক পুলিশের মতো অ্যাম্বুলেন্স আগে দেওয়া, লাইন ধরে গাড়ি চলতে দেওয়া, মামলা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বলেন, গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করছে মন্ত্রী-এমপিরা।

যিনি মন্ত্রী তিনিই আবার পরিবহন শ্রমিক নেতা। তারা সড়কে মানুষ মেরেও কাউকে ভয় পায় না। এ অবস্থায় কারা এগিয়ে আসবে! আজ সবখানে রাজনীতি। অপরাজনীতির কারণে কেউ কথা বলে না। যে শিশুদের নিয়ে আমরা এতদিন চিন্তিত ছিলাম, আজ তারাই ভালো উদ্যোগে রাস্তায় নেমে এসেছে। তবে এটা ভালো পরিণতি নয়। এজন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখনই উদ্যোগ নেওয়া দরকার। হোক দুই মাসের; যাতে সড়কপথ নিরাপদ হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক এলাহী চৌধুরী বলেন, দেশে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন হয়। কিন্তু পুলিশেরই যে গাড়ির কাগজপত্র নেই, তা কে জানত! এ অবস্থা সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেলায়ও। কিন্তু ছাত্ররা রাস্তায় নামবে এটা বেশিদিন চলতে পারে না। তাই সরকারের যেন বোধোদয় হয়ে এখনই পলিসি গ্রহণ করে, যাতে সড়কপথে অরাজকতামুক্ত হয়।