মাশরাফীর যে সিদ্ধান্তে পাল্টে গেল খেলার ধারা

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে যাওয়ার আশা টিকিয়ে রাখল বাংলাদেশ। রোববার আমিরাতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাংলাদেশ ৩ রানে পরাজিত করে আফগানিস্তানকে। এই পরাজয়ের ফলে আফগানিস্তান ছিটকে গেল এশিয়া কাপ থেকে। এখন ফাইনালে যাওয়ার দৌড়ে আছে ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান। ভারতের কাছে পাকিস্তান হেরে যাওয়ায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখন বেশ ভালোভাবেই আছে।

অথচ রোববারের ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসের মাঝপথে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ ছিটকে গেছে। চরম আশাবাদী ব্যক্তিটিও আশাহত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কোণঠাসা বাঘের মতো বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ইতিহাসের অন্যতম জয় ছিনিয়ে নিয়েছে।

মোস্তাফিজকে অবশ্যই এ জন্য কৃতিত্ব দিতে হয়। কিন্তু নেপথ্য নায়ক কিন্তু অন্যজন। তিনি হলেন মাশরাফি মর্তুজা। অধিনায়ক। একেই বলে অধিনায়ক। তার একটি সিদ্ধান্তে খেলার মোড় ঘুরে গেছে। তিনি এই ঝুঁকি না নিলে হয়তো খেলার ফলাফল অন্য হতে পারত।

খেলার তখন ৪৬তম ওভার। শেষ ২৪ বলে আফগানিস্তানের দরকার ৪২ রান। হাতে উইকেট আছে ৫টি। তখন বল করার কথা মাশরাফির। কিন্তু না। তিনি বল দিলেন মোস্তাফিজকে। পরের তিন ওভারই যেন মোস্তাফিজ বল করতে পারেন, সে জন্যই এই সিদ্ধান্ত। ফল পাওয়া গেল অবিশ্বাস্য জয়ে।

এটি ঠিক ওই ওভারে মোস্তাফিজ দিয়েছিলেন ৯ রান। কিন্তু খুব বেশি কি? মাশরাফি আসেন পরের ওভার বল করতে। ১১ রান দেন। ৪৮তম ওভারে মোস্তাফিজ দেন ১২ রান। উত্তেজনা আরো বেড়ে গেল।

৪৯তম ওভারে সাকিব আল হাসান ১টি উইকেট নেন। রান দেন ১১। মোহাম্মদ নবীকে বিদায় করায় কিছুটা স্বস্তি বাংলাদেশ শিবিরে।  তারপর ইতিহাস সৃষ্টি করলেন মোস্তাফিজ শেষ ওভারের জাদুতে।

আরো পড়ুন: শেষ ওভারে মোস্তাফিজের জাদুকরী বোলিং; শ্বাসরূদ্ধকর ম্যাচে টাইগারদের জয়

৫০তম ওভারে মোস্তাফিজ যখন বল হাতে নেন আফগানদের দরকার আট রান, হাতে ৪ উইকেট। টি-টোয়েন্টি ও পাওয়ার প্লের এই যুগে যেটি মোটেই কঠিন নয়। এখনকার সময়ে স্লগ ওভারে ১৫-১৬ রান নিয়ে ম্যাচ জেতার বহু উদারহরণ আছে। কিন্তু কাটার মাস্টার যখন নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেন, দল জেতার আর কোনো উপলক্ষ লাগে না।

শেষ ওভারে ক্রিজে ছিলেন ১৭ বলে ২৩ রান করা সামিউল্লাহ শেরওয়ানি ও আগের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি করা লেগ স্পিনার রশিদ খান। আগের ম্যচেই বাংলাদেশ দেখেছে রশিদ কতটা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে জানেন। তাই এক ওভারে ৮ রান নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারেনি কোন দর্শর্ক। পরিস্থিতি তাই পুরোটাই ছিলো আফগানদের অনুকূলে। কিন্তু মোস্তাফিজ সেটাই পাল্টে দিলেন।

প্রথম বলে কাভার অঞ্চলে খেলে দুই রান নিলেন রশিদ খান। কিন্তু দ্বিতীয় বলে ছক্কা মারতে গিয়ে বল তুলে দিলেন মোস্তাফিজের হাতেই। নিজের বলে নিজেই ক্যাচ নিলেন কাটার মাস্টার। ততক্ষণে অবশ্য দৌড়ে স্ট্রাইকে চলে যান শেরওয়ানি। চার বলে দরকার ছয় রান। পরের বলে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচের মতো উঠেছিল; কিন্তু আম্পায়ার নাকচ করে দিলেন, রিপ্লেতেও দেখা গেল বল প্যাডে লেগেছে। লেগবাই সূত্রে এলো এক রান।

৩ বলে দরকার পাঁচ রান। চতুর্থ বলে পরাস্ত হলেন নতুন ব্যাটসম্যান গুলবুদ্দিন নাইব। সমীকরণ দাঁড়াল ২ বলে ৫ রানের। পঞ্চম বলেও ব্যাটে বলে করতে পারেননি নাইব, তবে দৌড় থামেনি তাদের। লেগ বাই থেকে এবারো একটি রান। শেষ বলে আফগানদের দরকার ছিল ৪ রান।

গ্যালারির সব দর্শক তখন দুরদুরু বক্ষে অপেক্ষ করছে, ভরা গ্যালারিও পুরোপুরি নিশ্চুপ। স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বল করলেন মোস্তাফিজ, গুড লেন্থের বলটি ছিলে কিছুটা রাইজিং ডেলিভারি। সজোরে ব্যাট চালালেন শেরওয়ানি; কিন্তু ব্যাটে বলে হলো না। এতটাই জোরে ব্যাট চালিয়েছিলেন যে, হাত থেকে তার ব্যাটই ছুলে গিয়ে পড়ল শর্ট মিড উইকেট অঞ্চলে। জয়ের আনন্দে মেতে উঠল বাংলাদেশ।

এই ম্যাচে ৯ ওভার বোলিং করে একটি মেডনসহ ৪৪ রান খরচায় ২ উইকেট নিয়েছেন মোস্তাফিজ। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মাশরাফিও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন তার তরুণ তুর্কিকে।