অল্পের জন্য পারলেন না ব্রাফেট, পারল না উইন্ডিজ

এবার উল্লাসে মাততে পারলেন না অল্পের জন্য। বরং নুয়ে পড়লেন মাটিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দিতে দিতেও শেষ পর্যন্ত গলায় পরলেন পরাজয়ের মালা।

ব্রাফেটের ৮২ বলে ৯ চার ও ৫ ছক্কায় ১০১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংসের পরও নিউজিল্যান্ডের কাছে ৫ রানে হেরে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। নিউজিল্যান্ডের করা ২৯১ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থামে ২৮৬ রানে।

১ উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ৫ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দরকার ছিল ৪৭ রান। তখন ৬২ বলে ৬০ রানে অপরাজিত ব্রাফেটের সঙ্গী এগারো নম্বরে নামা ওশানে টমাস। সমীকরণটা শেষ তিন ওভারে দাঁড়ায় ৩৩ রানে। ৪৮তম ওভারে ম্যাট হেনরিকে তিন ছক্কা ও এক চারে ব্রাফেট তোলেন মোট ২৫ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জয়ের মাঝে ব্যবধান তখন মাত্র ৮ রানের, ওভার বাকি দুটি। ব্রাফেট অপরাজিত ৯৯ রানে।

পরের ওভারে জেমস নিশামের প্রথম তিন বলে কোনো রান নেননি ব্রাফেট। চতুর্থ বলে দুই রান নিয়ে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। পরের বল আবার ডট। শেষ বল ছক্কায় উড়িয়ে ম্যাচ শেষ করতে চেয়েছিলেন এক ওভার বাকি থাকতেই। শর্ট বলটা করেছিলেন পুল। বল সীমানার ওপারে গিয়ে পড়বে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সীমানায় কয়েক ইঞ্চি ব্যবধানে বলটা ছোঁ মেরে ধরে ফেলেন ট্রেন্ট বোল্ট! হতাশায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন ব্রাফেট। ততক্ষণে নিউজিল্যান্ড শিবিরে শুরু হয়ে গেছে উল্লাস।

ম্যাচটা উত্তেজনায় ভরপুর ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের পুরো ইনিংসজুড়েই। ফিল্ডিংয়ের সময় চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ায় ইনিংসের প্রথম ৯০ মিনিটে ব্যাটিংয়ে নামতে পারতেন না এভিন লুইস। লক্ষ্য তাড়ায় ক্রিস গেইলের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন তাই শাই হোপ। তবে তৃতীয় ওভারে ট্রেন্ট বোল্টের অফ স্টাম্পের বাইরের বল স্টাম্পে টেনে এনে হোপ ফেরেন ১ রানে।

তিনে নম্বরে নামা নিকোলাস পুরানও টেকেননি। সপ্তম ওভারে বোল্টের শর্ট বল পুল করার চেষ্টায় বাঁহাতি ব্যাটসম্যান বল তোলেন মাথার ওপরে আকাশে। পুরান ৭ বলে করেন ১ রান। তখন ২৯ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নেই ২ উইকেট।

পরের ওভারে ফিরতে পারতেন গেইলও। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ম্যাট হেনরির শর্ট বল পুল করে তুলেছিলেন ক্যাচ। শর্ট ফাইন লেগ থেকে দৌড়ে গিয়ে ডাইভ দিয়েও বল হাতে জমাতে পারেননি বোল্ট। ১৫ রানে জীবন পেয়ে পরের দুই বলে গেইল হাঁকান টানা দুই ছক্কা।

তৃতীয় উইকেটে শিমরন হেটমায়ারের সঙ্গে জুটি বেঁধে গেইল এগিয়ে নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ‘ইউনিভার্স বস’ ফিফটি তুলে নেন ৫১ বলে। ফিফটির পর গেইল মিচেল স্যান্টনারের এক ওভারেই ক্যাচ তুলেছিলেন আরো দুইবার। তবে ফিল্ডারের ব্যর্থতায় এই দুবারও তিনি বেঁচে যান।

তিনবার জীবন পেয়ে স্যান্টনারের পরের ওভারেই গেইল হাঁকান টানা দুই ছক্কা। লোকি ফার্গুসনকে ছক্কায় উড়িয়ে ৪২ বলে ফিফটি তুলে নেন হেটমায়ার। দুজনের ১২২ রানের জুটিটা তখন বেশ জমে গিয়েছিল। ২২ ওভার শেষে স্কোর ছিল ২ উইকেটে ১৪২ রান। ৮ উইকেট হাতে নিয়ে ২৮ ওভার থেকে দরকার ১৫০ রান।

এরপরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের নাটকীয় ধসের শুরু। ২৩তম ওভারে ফার্গুসন প্রথম দুই বলে ফেরান হেটমায়ার ও জেসন হোল্ডারকে। ব্যাক অব লেংথের বল ছক্কায় উড়ানোর চেষ্টায় লাইন মিস করে হেটমায়ার বোল্ড হন ৫৪ রানে। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়ে হোল্ডার ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে।

পরের ওভারে সেঞ্চুরির পথে থাকা গেইলকে থামান কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম। ছক্কায় উড়াতে গিয়ে বাউন্ডারিতে বোল্টের হাতে ধরা পড়েন ৮৪ বলে ৮ চার ও ৬ ছক্কায় ৮৭ রান করা গেইল।

পরে বোল্ট বোলিংয়ে এসে একই ওভারে ফেরান অ্যাশলে নার্স ও আট নম্বরে নামা লুইসকে। শর্ট বলে উইকেটকিপার টম ল্যাথামের দারুণ ক্যাচে ফেরেন নার্স। লুইসও শর্ট বলের শিকার, পুল করতে গিয়ে সহজ ক্যাচ দেন ডিপ স্কয়ার লেগে।

২৯ বল ও ২২ রানের মধ্যে পাঁচ ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর তখন ৭ উইকেটে ১৬৪! নিউজিল্যান্ড এবার সহজে জিতে যাবে বলেই মনে হচ্ছিল তখন। তবে রোমাঞ্চের যে তখনো বাকি!

কেমার রোচের (১৪) সঙ্গে ৪৭ ও শেলডন কটরেলের (১৫) সঙ্গে ৩৪ রানের জুটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ম্যাচে রাখেন ব্রাফেট। এরপর টমাসকে সঙ্গে নিয়ে জয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু খুব কাছে গিয়েও শেষটা রাঙাতে পারলেন না।

এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারে দুই ওপেনারকে হারানোর পরও যে নিউজিল্যান্ড প্রায় তিনশ রানের পুঁজি পেয়েছিল, তাতে পুরো অবদান কেন উইলিয়ামসন ও রস টেলরের। উইলিয়ামসন ১৪৮ ও টেলর করেন ৬৯ রান। দুজন গড়েন ১৬০ রানের জুটি। ১০ রানের মধ্যে ২ উইকেট হারানোর পর তৃতীয় উইকেটে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় জুটি এটি।

নিউজিল্যান্ডের শুরুটা হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। শেলটন কটরেলের ইয়র্কার লেংথের প্রথম বলে এলবিডব্লিউ মার্টিন গাপটিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ উইকেটটা পেয়েছে অবশ্য রিভিউ নিয়ে। পঞ্চম বলে আরেকটি দারুণ ইয়র্কারে বোল্ড মার্টিন গাপটিল। দুই ওপেনারই মারেন গোল্ডেন ডাক।

উইলিয়ামসন-টেলরের ব্যাটে নিউজিল্যান্ড শুরুর ধাক্কাটা সামলে ওঠে দারুণভাবে। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেন দুজন। উইলিয়ামসন ফিফটি পূর্ণ করেন ৭৫ বলে, টেলর ৬৮ বলে। জুটির সেঞ্চুরি পূর্ণ হয় ১৪২ বলে।

টেলরকে ফিরিয়ে রেকর্ড জুটি ভাঙেন ক্রিস গেইল। রান বাড়ানোর চেষ্টায় ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কায় উড়াতে চেয়েছিলেন ডানহাতি ব্যাটসম্যান। মিড অফে ক্যাচ নেন জেসন হোল্ডার। ৯৫ বলে ৭ চারে ৬৯ রান করেন টেলর।

উইলিয়ামসন এরপর চালিয়ে গেছেন। টুর্নামেন্টে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন ১২৪ বলে। সেঞ্চুরির পর তিনি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। দেড়শ থেকে দুই রান দূরে থাকতে তাকে থামান কটরেল। ১৫৪ বলে ১৪ চার ও একটি ছক্কায় ক্যারিয়ার সেরা ১৪৮ রানের ইনিংসটি সাজান কিউই অধিনায়ক।

শেষ দুই বলে ২ উইকেট হারালেও জেমস নিশামের ২৩ বলে ২৮, কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমের ৬ বলে ১৬ ও মিচেল স্যান্টনারের ৫ বলে ১০ রানের সুবাদে তিনশর কাছাকাছি পুঁজি পায় নিউজিল্যান্ড।

কটরেল ১০ ওভারে ৫৬ রানে নেন ৪ উইকেট। ৬ ওভারে ৫৮ রানে ২ উইকেট নেন ব্রাফেট। পরে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে ম্যাচের নায়কও প্রায় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নায়ক হয়ে গেলেন উইলিয়ামসন।

ষষ্ঠ ম্যাচে পঞ্চম জয়ে ১১ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠেছে নিউজিল্যান্ড। কিউইরা সেমিফাইনালেও এক পা দিয়ে রাখল। সমান ম্যাচে ষষ্ঠ হারের স্বাদ পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেমিফাইনালের আশা কার্যত শেষ।