প্রশংসায় ভাসছেন গ্রামের মানুষদের জন্য বাংলাদেশে আসা ডাক্তার দম্পতি

সুযোগ সুবিধার কমতি থাকার অজুহাতে দেশের চিকিৎসকরা যখন গ্রামের মানুষদের সেবা দেয়ায় অনাগ্রহী, তদবির করে গ্রামে যাওয়ার বদলি ঠেকাতে ব্যস্ত- তখন সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে এসে চিকিৎসাসেবা দিতে স্থায়ী বসতি গড়ায় প্রশংসায় ভাসছেন এক দম্পতি। তারা হলেন জেসন ও মারিন্ডি। শুধু তারাই নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তাদের শিশু সন্তানদেরও। যারা এ দেশেই লেখাপড়া শুরু করেছে।

এ দম্পতি দায়িত্ব নিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের কালিয়াকুড়িতে গরিবের জন্য গড়ে তোলা ‘ডাক্তার ভাই’ নামে পরিচিত ‘এড্রিক বেকারের হাসপাতালের’। বেকার মারা যাওয়ার পর হাসপাতালটি তারাই তত্ত্বাবধান করছেন। শুক্রবার বিটিভিতে প্রচারিত হানিফ সংকেতের ইত্যাদি অনুষ্ঠানে এই দম্পতিকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

দরিদ্র মানুষের জন্য নিউজিল্যান্ডের চিকিৎসক এড্রিক বেকারের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের হাল ধরে প্রশংসায় ভাসছেন আমেরিকান এই দম্পতি। ইত্যাদির ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টানা ৩২ বছর গ্রামের দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসা দেয়ার পর মারা যান ‘ডাক্তার ভাই’ হিসেবে পরিচিত ডাক্তার এড্রিক বেকার। দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হলে অনেকেই চেয়েছিলেন তাকে ঢাকাতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিতে। তিনি ঢাকায় যাননি, তার তৈরি হাসপাতালেই ২০১৫ সালে মারা যান।

মৃত্যুর আগে তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশি কোনো ডাক্তার যেন গ্রামে এসে তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের হাল ধরেন, কিন্তু এ দেশের একজন ডাক্তারও তার সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। দেশের কেউ সাড়া না দিলেও এড্রিক বেকারের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন আমেরিকার এক হৃদয়বান দম্পতি জেসন ও মারিন্ডি। ডা. এড্রিক বেকার বেঁচে থাকার সময় কালিয়াকুড়ির এই হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছিলেন জেসন। পরবর্তীতে ডাক্তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে জেসন অস্থির হয়ে উঠেন। কিন্তু তখন নিজের প্রশিক্ষণ ও ছেলেমেয়েরা ছোট থাকার কারণে জেসন বাংলাদেশে আসতে পারেননি।

অবশেষে সবকিছু গুছিয়ে সম্পদ আর সুখের মোহ ত্যাগ করে ২০১৮ সালে পুরো পরিবার নিয়ে আমেরিকা ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে আসেন মধুপুরে। জেসন হয়ে উঠেন নতুন ‘ডাক্তার ভাই’ আর মারিন্ডি হয়ে উঠেন ‘ডাক্তার বিবি’। বাংলাদেশে আসার সময় নিজেদের সন্তানদেরও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তারা। ইতিমধ্যে ভর্তি করে দিয়েছেন গ্রামেরই স্কুলে। তারা গ্রামের শিশুদের সঙ্গে লেখাপড়া ও খেলাধুলা করে।

অবসরে ডাক্তার জেসিনও লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ান। তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশি ফল ও খাবার। জেসন-মারিন্ডি বাংলায় কথা বলতে পারেন। সন্তানদেরও বাংলা ভাষা শেখাচ্ছেন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন এই দম্পতি। ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশি ডাক্তারদের গ্রামে গিয়ে দরিদ্র মানুষের সেবার আহ্বান জানিয়েছেন জেসন-মারিন্ডি।

এদিকে প্রতিবেদনটি ভাইরাল হওয়ার পর জেসন-মারিন্ডি দম্পতির প্রশংসা করেছেন নেটিজেনরা। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসে দরিদ্র মানুষের সেবা করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তারা তা নজিরবিহীন বলেও মনে করেছেন অনেকেই। কেউ কেউ বলছেন, আমরা সুযোগ পেলেই গ্রাম থেকে শহরে ছুটি। শহর থেকে বিদেশ পাড়ি দেই। শিশু জন্মের পর থেকেই চিন্তা থাকে কত দ্রুত সন্তানকে আধুনিক মিডিয়াম ইংরেজি স্কুলে বাচ্চাকে পড়াব। ইত্যাদির প্রতিবেদনটা দেখলাম। ডা. জেসন এবং মারিন্ডি দম্পতি আমাদের এক বিশাল লজ্জায় ফেলে দিলেন।

লুঙ্গি পরায় জেসনের প্রশংসা করে একজন লিখেছেন, লুঙ্গি পরাতো আমাদের রুচির সঙ্গে আজ বড়ই বেমানান। লুঙ্গি পরতে পারি না বলতে পারলে- আমাদের আভিজাত্যের পারদ শুধু একটুকু না অনেকটুকুই বাড়ে। বনানী, গুলশান অভিজাত এলাকায় তো একবার লুঙ্গি পরাই নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কারণ ওরা জানে না ওদের প্লেটে যে খাবার যায়- তা এদেশের লুঙ্গি গামছা পরা কৃষকরাই তুলে দেয়।