করোনাভাই’রাস প্রতিরোধে ইসলামী দৃষ্টিতে করণীয়

১. সতর্কতামূলক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় ইসলাম গুরুত্ব প্রদান করে। এ কারণে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো।” (সূরা আননিসা: ৭১) হাদীসে শারী’রিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা বলেন, “তোমার ওপর তোমার শরীরেরও অধিকার রয়েছে।” (বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৮)

২. আ’তংকিত না হয়ে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হওয়া: কেননা আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বি’পদই আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। তিনি বলেন: “আল্লাহ যা আমাদের জন্য লিপিবদ্ধ করেছেন তা ছাড়া কোনো কিছুই আমাদের স্পর্শ করবে না; তিনিই আমাদের অভিভাবক। আল্লাহর উপরই মুমিনদের নির্ভরশীল হওয়া উচিৎ।” (সূরা আততাওবা, ৫১)

৩. লক ডাউন: যে এলাকায় ম’হামারি আ’ক্রান্ত হয় সে এলাকার প্রবেশ ও বাহির বন্ধ করে দেয়া। এ সম্পর্কে মহানবী সা. বলেন, “যদি তোমরা শুনতে পাও কোনো জনপদে প্লেগ বা অনুরূপ মহামারীর প্রাদু’র্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা তথায় গমন করবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছ তথায় তার প্রাদু’র্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (বুখারী, হাদীস নং ৫৩৯৬)

৪. আইসোলেশন (Isolation): মহামা’রী রোধে আক্রা’ন্ত ব্যক্তিকে পৃথক রাখাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আইসোলেশন বলা হয়। মহানবী সা. এ সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, অসুস্থকে সুস্থের কাছে নেয়া হবে না। (বুখারী, ৫৭৭১ ও মুসলিম, ২২২১)

৫. হোম কোয়ারেন্টাইন (Quarantine): সুস্থ ব্যক্তি মহামারীতে আক্রা’ন্তের আ’শংকায় জনবিচ্ছিন্ন থাকাকে কোয়ারেন্টাইন বলা হয়। বিভিন্ন হাদীসে এভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন মহানবী সা বলেন, কোনো বান্দা যদি মহামা’রী আ’ক্রান্ত এলাকায় থাকে এবং নিজ বাড়িতে ধৈর্য সহকারে, সওয়াবের নিয়তে এ বিশ্বাস বুকে নিয়ে অবস্থান করে যে, আল্লাহ তাকদিরে যা চূড়ান্ত রেখেছেন তার বাইরে কোনো কিছু তাকে আক্রা’ন্ত করবে না, তাহলে তার জন্য রয়েছে শহীদের সমান সওয়াব। (বুখারী, ৩৪৭৪ ও মুসনাদে আহমাদ, ২৬১৩৯)

৬. মুসাফাহা ও কোলাকুলি এড়িয়ে চলা: কেননা এর মাধ্যমে সংক্রা’মণের ভয় থাকে। রাসূলুল্লাহ সা. সাকিফের প্রতিনিধি দলের মধ্যকার কু’ষ্ঠ রোগীকে হাতে হাতে বাইয়াত না দিয়ে লোক মারফত বলে পাঠান, “তুমি ফিরে যাও। আমি তোমার বাইআত নিয়ে নিয়েছি।” (মুসলিম, ২২৩১)

৭. সার্বিক পরিচ্ছন্ন থাকা: কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মুমিনদেরকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। “আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২২২), হাদীসে পবিত্রতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। শরীয়াতের বিভিন্ন বিধানকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম নির্ধারণ করা হয়েছে:

ওজুর মাধ্যমে মানুষের শরীরের অনাবৃত্ত অ’ঙ্গ-প্রত্য’ঙ্গ ধৌত করা হয়;
মেসওয়াকের মাধ্যমে মুখের সব ধরনের জী’বাণু ধ্বং’স হয়;

সামগ্রিকভাবে সর্বক্ষণ ও বিশেষত সালাতে পরিধেয় কাপড় পরিচ্ছন্ন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: “তোমার কাপড় পরিস্কার রাখো।” (আল-মুদ্দাচ্ছির, ৪)

৮. গু’জবে কান না দেয়া ও গু’জব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা: ইসলামে যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য গ্রহণ করা নিষি’দ্ধ। আল্লাহ বলেন, “কোনো অসমর্থিত ব্যক্তি কোনো খবর দিলে তোমরা তা যাচাই করো।” (সূরা আল-হুজুরাত: ৬) এ সম্পর্কে মহানবী সা. বলেন, “যাচাই না করে শোনা খবর বিশ্বাস করা মিথ্যুক হওয়ার নামন্তর।” (মুসলিম, ৫)

৯. ঘরে নামায আদায় করা: আপদকালীন অবস্থায় মহানবী সা. সাহাবীগণকে বাড়িতে নামায আদায়ের নির্দেশ দেন। তিনি মুআজ্জিনকে আজানের মধ্যে বলতে বলেন, “আলা সাল্লু ফী রিহালিকুম” (তোমরা নিজ নিজ অবস্থানে নামায আদায় কর)। (বুখারী ৬৬৬, মুসলিম ৬৯৭) তাঁর ইন্তিকালের পরে সাহাবীগণও একইভাবে আমল করতেন। সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে এর প্রমাণ বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি মুআজ্জিনকে নির্দেশ দেন আজানে “সাল্লু ফী বুয়ূতিকুম” (তোমরা বাড়িতে সালাত আদায় কর) অংশটি যোগ করার জন্য। (বুখারী ৬৬৮, মুসলিম ৬৯৯) ইসলামী শরীআর উদ্দেশ্য ও মহামারীর গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় মিসর, সৌদীআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফিকহ কমিটি ও ইসলামী ফাউন্ডেশন মসজিদে মুসল্লীদের উপস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রতি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে সকলকে ঘরে ইবাদাত করার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

১০. গরীব-অসহায় ও নিম্ন আয়ের লোকদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা: করোনা ভাই’রাস প্রতিরোধে ঘোষিত লকডাউনের এ দিনগুলোতে গরীব-অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা বৃত্তবানদের ওপর আবশ্যক। এ মহৎ গুণের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, “খাদ্য দান করা দু’র্ভিক্ষের দিনে। ইয়াতীম আত্মীয়-স্বজনকে। অথবা নিঃস্ব মিসকীনকে।” (সূরা আল-বালাদ, ১৪-১৬)

১১. ভাই’রাস প্রতিরোধে ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা: ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম সরকার জনকল্যাণ বিবেচনায় কোন নির্দেশনা দিলে এবং তা শরীয়াহর সাথে সাংঘ’র্ষিক না হলে তা মান্য করা অপরিহার্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসূলের ও তোমাদের নেতৃস্থানীয়দের।” (সূরা আন-নিসা, ৫৯)

এ কঠিন সময়ে আমাদের উচিৎ বেশি বেশি (১) তওবা, (২) ইস্তেগফার, (৩) নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামায, (৪) কুরআন তিলাওয়াত, (৫) শাবান মাসের নফল রোযা, (৬) তাহাজ্জুদ নামায ও (৭) রাসুলুল্লাহ সা. এর ওপর দুরুদ পাঠ করা।

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন তালুকদার, লেখক: অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, শরীয়াহ সুপারভাইজারী কমিটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড এবং খতীব, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জামে মসজিদ।