বিদায় কিংবদন্তির, একনজরে ড. আনিসুজ্জামান

দেশপ্রেম, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে সব কাজেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যাপিত জীবনে অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন। লেখনী ও কথাবার্তায় পরিমিত ও আকর্ষণীয়। তার জাদুবিস্তারী বাগ্মিতা, বিনয় ও নম্রতা মুগ্ধ করেছে, প্রাণিত করেছে অসংখ্য মানুষকে। তিনি হলেন দেশের প্রবীণ শিক্ষাবিদ, ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান স্যার। দেশের এই কিংবদন্তি আজ রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এই বিশিষ্ট লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে তার। গবেষক ও সাহিত্যিক হিসেবে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি একজন প্রফেসর ইমেরিটাস।

আলাপচারিতা ও নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি বন্ধু ও আড্ডাপ্রিয় মানুষ। এ জন্য অনেক কাজ করতে পারিনি। অথচ করা উচিত ছিল। তবে যেটুকু করতে পেরেছি, মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা কম নয়।’

একনজরে ড. আনিসুজ্জামান

বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই শিক্ষাবিদ ও লেখক ১৯৩৭ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিনী হলেও লেখালেখির অভ্যাস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই বোন। তিন বোনের ছোট আনিসুজ্জামান, তারপর আরেকটি ভাই। বড় বোনও নিয়মিত কবিতা লিখতেন। বলা যায়, শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ছিল তাদের পরিবার।

কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু করেন আনিসুজ্জামান। ওখানে পড়েছেন তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরে এদেশে চলে আসার পর অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। কিন্তু বেশিদিন এখানে পড়া হয়নি। একবছর পরই পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় ভর্তি হন প্রিয়নাথ হাইস্কুলে।

সেখান থেকে ১৯৫১ সালে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে বাংলায় অনার্স নিয়ে বিএ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ সালে তিনি অনার্স পাস করেন এবং ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির প্রথম গবেষণা বৃত্তি পেলেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক শূন্যতায় বাংলা একাডেমির বৃত্তি ছেড়ে দিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করেন আনিসুজ্জামান। সাফল্য কিংবা খ্যাতি তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি সাধারণ জীবন থেকে, বিচ্যুত করতে পারেনি আদর্শ থেকে। কিশোর থেকে যুবা, যুবা থেকে বৃদ্ধ- প্রত্যেকেই যেন তাঁর বন্ধু, আপনজন। মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছপা হননি, কখনো দূরে সরে যাননি। যখনই তাঁকে কেউ ডেকেছেন, সাড়া দিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছেন। মানুষের দুঃখের সঙ্গী, আনন্দেরও সঙ্গী তিনি। দেশ ও জাতির সংকটে, সম্ভাবনায়ও এগিয়ে এসেছেন তিনি।

১৯৭১ সালের ৩১ মাচ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই অবস্থান করেছিলেন। পরে ভারতে গিয়ে প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

তারপর বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান ষ্টাডিজে গবেষণা করেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন ২০০৩ সালে।

পরে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যুক্ত হন। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনষ্টিটিউট অব এশিয়ান ষ্টাডিজ কলকাতা, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নথ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। এছাড়া তিনি নজরুল ইনষ্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শিল্পকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা যামিনী এবং বাংলা মাসিকপত্র কালি ও কলম এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

মুজিবনগরে তিনি তাজউদ্দীনের বিচক্ষণ কর্মকাণ্ড সরজমিনে কাছ থেকে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মহান ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

তার প্রকাশিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে- মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, মুনীর চৌধুরী, স্বরূপের সন্ধানে, Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity, Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Official Library and Records, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, পুরোনো বাংলা গদ্য, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, Creativity, Reality and Identity,Cultural Pluralism, Identity, Religion and Recent History, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, আমার চোখে, সাহিত্যে ও সমাজে, পূর্বগামী, কাল নিরবধি, ‘আদর্শ স্বামী’, নজরুল রচনাবলী ১-৪ খণ্ড, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী -১ ও ৩ খণ্ড, আমার একাত্তর, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন অসংখ্য পুরষ্কার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা, দাউদ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, একুশে পদক, আনন্দ পুরষ্কার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট, এশিয়াটিক সোসাইটিতে কলকাতা ইন্দিরাগান্ধী স্মারক বক্তৃতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরত্‍চন্দ্র স্মারক বক্তৃতা, নেতাজী ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান অ্যাফেয়ার্সে নেতাজী স্মারক বক্তৃতা, অণুষ্টুপের উদ্যোগে সমর সেন স্মারক বক্তৃতা প্রদান এবং পদ্মভূষণ পদক।

তথ্য সূত্র : pnsnews24