রান্না করছেন মা, দিনে দুইশ’ মানুষের খাবার দিচ্ছেন ছেলে

‘আমিও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। খুব বেশি সামর্থ্য আল্লাহ দেননি। অনেক কিছু করার ইচ্ছা থাকলেও জানি সব পারবো না। তবে কথা দিচ্ছি করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব যতোদিন থাকবে ততোদিন অসহায় মানুষের জন্য নিজের সাধ্যমত করে যাব। বিগত দিনগুলোতে যেটুকু সাহায্য করতে পেরেছি সেটিকে অব্যাহত রাখতে চেষ্টা করবো। মায়ের রান্না করা ভালবাসার উপহার চলতেই থাকবে।’

কথাগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিদুয়ান ইবনে ছাত্তারের। যিনি নিজ বাড়িতে রান্না করা খাবার প্রতিদিন শতাধিক মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছেন। গল্পটার শুরু যখন দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। চবির এই শিক্ষার্থী দেখলেন তার সামনের পরিবহন শ্রমিক, রিকশাচালক, ছোট টং দোকানদার, বাদাম বিক্রেতা, ঝাল মুড়ি-চটপটি বিক্রেতা এই মানুষগুলো এখন কর্ম হারিয়ে অসহায়। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন তারাই।

তখনই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সাহায্যের চিন্তা করলেন পিতৃহারা রিদুয়ান ইবনে ছাত্তার। এই মানুষগুলোকে না খেয়ে থাকতে দিবেন না বলে চিন্তা করলেন। তাই উদ্যোগ নিলেন, খাবার পৌঁছে দিতে হবে তাদের। এদিকে রান্নার সব দায়িত্ব নিলেন তার মা রাশেদা আমিন। সেই থেকে মায়ের রান্না খাবার প্রতিদিন প্রায় দুইশ’ মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষকে খাবার দিয়েছেন এই মা-ছেলে।কোনোদিন ইফতারের আগে ২০০ প্যাকেট, কোনোদিন সেহরিতে ১৫০ আবার কোনদিন ১০০ জনকে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।

তৈরি খাবার ছাড়াও নিজের জমানো টাকায় প্রায় ৪০টি পরিবারকে সহায়তা সামগ্রী দিয়েছেন তিনি। রাস্তায় কিংবা ভাসমান অসহায় মানুষগুলো এখনো দুবেলা খাবারের আশায় থাকে। রিদুয়ান সেইসব মানুষের জন্য প্রতিদিন ছুটে যান খাবার নিয়ে। মানবিক কাজে সবচেয়ে বেশি যিনি আর্থিক এবং মানসিক সব দিক থেকে সহযোগিতা করেছেন তিনি রিদুয়ানের স্বজন বড় ভাই আলী আকবর চৌধুরী মিন্টু। খাবার বিতরণের সময়েও পাশে পান আকবরকে। আলী আকবরের গাড়ি ব্যবহার করেই অনেক দিন খাবার বিতরণে যান তিনি।

রিদুয়ান বলেন, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, পরিচিত বড় ভাই মাঝে-মধ্যে সহযোগিতা করেছেন। আর রান্নায় মায়ের সঙ্গে কাজে সহায়তা করে আমার আপন ছোটো ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনোমিক্স বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ। আর বিতরণের কাজে সহায়তা করছেন বড় ভাই শাহরিয়ার তানিম, ছোটো ভাই সানি ও কিছু বন্ধু। মাকে দিয়েই কেন সব রান্না করেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে রিদুয়ান বলেন, এই প্রশ্ন অনেকেই করেন। আসলে করোনার কারণে বাসার কাজে সহযোগিতা করার কোনো লোক বাইরে থেকে আসা নিরাপদ না। আর আম্মার পক্ষে আমাদের সহযোগিতায় দেড়-দুইশ’ জনের রান্না করা সম্ভব। আম্মাও বেশ খুশি হয় মানুষের জন্যে এইটুকু করতে পেরে।

ডেইলি বাংলাদেশকে রিদুয়ান ইবনে ছাত্তার বলেন, মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। সেই দায়িত্ব থেকেই আমার মানবিক এই প্রচেষ্টা। আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী। আমার কাছে রাজনীতির অর্থ হচ্ছে মানুষের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটানো। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হচ্ছে রাজনীতির আসল সৌন্দর্য। রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছি ফুটপাতের ভিক্ষুক, ছিন্নমূল মানুষ ও অসহায় পথ শিশুদের।

ছেলের এমন মানবিক কাজের ব্যাপারে মা রাশেদা আমিন বলেন, ছেলের ভালো কাজের অংশীদার হতে পেরে খুব খুশি। মানুষের সেবা করার মাঝে একটা তৃপ্তি আছে। অন্তত এইটুকু বলতে পারি যে, একটু কষ্ট হলেও ছেলেটাতো খুশি হচ্ছে। যে মানুষগুলো আমার রান্না করা খাবার খাচ্ছে তাদের হাসি আমি দেখতে না পেলেও আমার রান্না করা খাবারগুলো মানুষকে দিয়ে এসে ছেলের মুখে যে হাসি দেখতে পাই তাতেই আমার শান্তি লাগে। ছেলের মতো সবার উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ