স্কুলশিক্ষক এখন দিনমজুর

এখন দিনমজুরের কাজ করেন স্কুলশিক্ষক বিরাম চন্দ্র বিশ্বাস। সর্বগ্রাসী করোনা তাকে শ্রমিক বানিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কখনো কারো পুকুরে জাল টেনে দিচ্ছেন, কখনো কারো ক্ষেত-খামারে ৩০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। দুই মেয়ে, এক ছেলে, মা ও স্ত্রীকে নিয়ে তার পরিবার। সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ পথ। এভাবে যখন যে কাজ পাচ্ছেন তাই করছেন তিনি।

তবে এখানেও রয়েছে বিপত্তি। শিক্ষক হিসেবে মর্যাদার কারনে অনেকে ‘চক্ষুলজ্জায়’ তাঁকে কাজে নিতে দ্বিধাবোধ করেন। একারনে অনেক সময় তার কাজও জোটেনা। এখন এমন মানবেতরভাবে কাটছে মানুষ গড়ার কারিগর বিরাম চন্দ্র বিশ্বাসের দিন। এক নন এমপিও শিক্ষকের মাধ্যমে জানা যায় বিরাম চন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতির কথা। গত সোমবার (২২ জুন) সকালে কথা হয় শিক্ষক বিরাম চন্দ্রের সাথে। তিনি তখন যশোরের চাঁচড়ায় মাছের পোনা বিক্রির হাপায় কাজ করছিলেন। তিনি প্রথমে একটু ইতস্তত করছিলেন এ বিষয়ে কথা বলতে। পরে দ্বিধা ঝেড়ে তিনি জানালেন তার মানবেতর জীবন সংগ্রামের কথা।

যশোর সদর উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামের বি,এম,এস নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তিনি। বললেন, ‘ কী করবো? ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে তো থাকতে হবে। আমরা করোনার আগে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতনের থেকে সামান্য কিছু টাকা পেতাম। পাশাপাশি কয়েকটি টিউশনি করে কোনরকমে পরিবার নিয়ে টিকে ছিলাম। করোনার পর থেকে স্কুল বন্ধ। টিউশনিও বন্ধ। এ কারণে আমাদের জীবনযাপন অচল হয়ে পড়েছে। নন এমপিও স্কুলের শিক্ষক হওয়ায় সরকারি কোনো সহযোগিতাও পাইনা। এমন অবস্থায় আমাদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অন্যের ক্ষেতে মজুরি খাটি।

অন্যের পুকুরে মাছ চাষের কাজসহ মানুষ যখন যে কাজে ডাকে সেই কাজ করি। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। শিক্ষকতা করি বিধায় আমাদেরকে অনেক লোকে কাজে নিতে চাননা। সবমিলিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় আমাদের দিন কাটছে।’ শিক্ষক বিরাম চন্দ্র বিশ্বাসের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের তোলা গোলদার পাড়া গ্রামে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তার গ্রামে গিয়ে কথা হয় তার প্রতিবেশি দিলিপ কুমারের সঙ্গে। তিনি বললেন, বিরাম চন্দ্র বর্তমানে বাধ্য হয়েই দিনমজুরির কাজ করছেন। তবে তিনি শিক্ষক হওয়ার কারণে অনেকেই তাকে কাজে নিতে লজ্জাবোধ করেন।

আমি নিজেই গত সপ্তাহে অন্য লোক দিয়ে পুকুরে জাল টেনেছি। কিন্তু শিক্ষক হওয়ার কারনে বিরাম চন্দ্রকে শ্রমিক হিসেবে হিসেবে কাজে নেওয়ার কথা বলতে পারিনি। তাকে ‘জনের’(শ্রমিক) কাজ করতে বলতে খারাপ লাগে।’ বিরাম চন্দ্রের মতই করুণ অবস্থা একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক গনেশ চন্দ্র সরকারের। তিনি জানালেন, সব শিক্ষকের প্রায় একই অবস্থা। গ্রামের স্কুল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে স্কুলের খরচ মিটিয়ে শিক্ষকদের হাতে তেমন কিছুই তিনি দিতে পারেননা। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাপন খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

এমনকি তার নিজেরও চলা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বললেন, ‘শহরে কয়েকটা বাড়ি যেয়ে টিউশনি করতাম। সেই টাকা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলতো। করোনার কারনে গত কয়েকমাস তাও বন্ধ। ধার দেনা করে সংসার চালাচ্ছি। আম্ফান ঝড়ে আমার এক ঘর পড়ে গেছে সেটাও ঠিক করতে পারছিনা। এমনকি আমার একটি মাত্র মেয়ের ছোট খাট আব্দারও পূরণ করতে পারছিনা।’ শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ে টিকে থাকার চেষ্টায় বিরাম চন্দ্রের মতো এমন অবস্থা নন এমপিও স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার অসংখ্য শিক্ষক কর্মচারীর।

মর্যাদার কারনে তারা না পারছেন হাত পাততে। না পারছেন কাউকে কিছু বলতে। অনেকে অন্য এলাকায় গিয়ে বা পরিচয় গোপন করে নানা উপায়ে বিকল্প আয়ের চেষ্টা করছেন।এ ব্যাপারে নন এমপিও স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশনের যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান জানান, যশোরের ৮ উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা মিলিয়ে ২৪৭টি নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৮শ ৩০ জনের মতো শিক্ষক এবং ৩শ ৬১ জন মতো কর্মচারী রয়েছেন।

নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা সরকার থেকে কোনো বেতন পাননা। শিক্ষার্থীদের দেওয়া বেতন থেকে শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা চলে, যা খুবই সামান্য। পাশাপাশি তারা টিউশনি করেই মূলত সংসার খরচ চালান। সরকারি সহায়তা কামনা করে তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। শিক্ষকরা এখন এতো মানবেতর জীবনযাপন করছে যে তা প্রকাশ করা যায়না। এরা যে কি করছে তা জনসম্মুখে বলাও ক’ষ্টকর। লজ্জা লাগে। একজন শিক্ষক হয়ে কেউ মাঝে মাঝে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে।

কেউ রিকসা চালাচ্ছে মাঝে মাঝে। নানাবিধ কাজ। যা আসলে প্রকাশ করা যায়না। এখন এই অবস্থায় পরিবেশ পরিস্থিতি সব মিলিয়ে আমাদের এই অবস্থা বোঝানোর ভাষা বা ক্ষমতা আমি রাখিনা। বা রাখতে পারছি না। ’

সূত্র: কালের কণ্ঠ অনলাইন।