মানুষের মাংস খান তারা!

পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসে মানুষখেকোদের বর্ণনা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গল্প কিংবা রূপকথায় প্রায় শোনা যায় এই মানুষখেকোদের কথা। কিন্তু এটা একদম পরিষ্কার সত্য যে এই একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবী থেকে এদের অস্তিত্ব মিলিয়ে যায়নি।

বিশ্বের বেশ কিছু দুর্গম স্থান এখনও রয়েছে, যেখানে সভ্যতার আলো পৌঁছায়নি। আবার কোথাও কোথাও এই ভয়ানক ব্যাপারটির অবসান ঘটেছে মাত্রই। পাঠক আসুন জেনে নি বিশ্বে এখনও যেসব স্থানে মানুষখেকোদের বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে, তাদের বিষয়ে।

১. সিগাটোকা, ফিজি: দেশটিতে একসময় মানুষখেকোরা থাকলেও এখন তাদের দেখা পাওয়া যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলে চন্দন ব্যবসায়ীরা আসা যাওয়া শুরু করলে আদিবাসীদের মাঝেও সভ্যতার আলো পৌঁছাতে থাকে। যদিও বলা হয় এই দ্বীপাঞ্চলটির কোথাও কোথাও এখনও মানুষ খাওয়ার প্রবণতা মিলিয়ে যায়নি। সিগাটোকার নাইহেহে গুহায় যেসব নিদর্শন মিলেছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা গেছে যে মানুষখেকোরা আসলে মিলিয়ে যায়নি।

২. কঙ্গো: আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় দেশটির আদিবাসীদের মাঝে এখনও মানুষ খাওয়ার প্রবনতা মিলিয়ে যায়নি। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাস আছে তাদের। ২০০৩ সালের গোড়ার দিকে কঙ্গোর বিদ্রো’হীদের বিরু’দ্ধে মানুষ খাওয়ার অভিযোগ তোলে খোদ জাতিসংঘ। দ্বিতীয় কঙ্গো যু’দ্ধের পর সরকারের এক প্রতিনিধি তাদের কর্মীদের জীবন্ত ছিড়ে খাওয়ার জন্য বিদ্রো’হীদের বিরু’দ্ধে অভিযোগ পর্যন্ত তোলেন।

৩. ভারত: অভিযোগ আছে, ভারতের বারাণসীতে এখনও একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে মানুষ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। আঘোরি সাধু নামে বিশেষ এক সন্নাসী সম্প্রদায় রয়েছে যারা মৃ’ত মানুষের মাং’স খেয়ে থাকে। যদিও প্রচলিত আছে এই সম্প্রদায় বিশেষ মার্গ সাধনার পদ্ধতি হিসেবে মানুষের মাংস খেয়ে থাকে।

৪. জার্মানি: আশ্চর্য হলেও সত্যি, জার্মানিতে মানুষের মাংস খাওয়া কোনো অপ’রাধ নয়। আর সেজন্যই ২০০১ সালের মার্চে আর্মিন মাইভাস নামের এক জার্মান নাগরিক রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষ খেলেও তার বিরু’দ্ধে খু’নের মা’মলা ছাড়া কোনো অভিযোগ আনেনি পুলিশ। মানুষ খাওয়ার উদ্দেশে ‘দি ক্যানিবাল ক্যাফে’ নামের একটি ওয়েবসাইটে সুঠামদেহী, জবাইযোগ্য এবং আহার হতে চাওয়া মানুষের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন দেন আর্মিন। অনেকে আগ্রহী হলেও বার্ন্ড জুর্গেন ব্রান্ডিসকে পছন্দ করেন আর্মিন। এরপর জার্মানির ছোট্ট গ্রাম রটেনবার্গে দুজনে মিলিত হন। একপর্যায়ে ব্রান্ডিসকে হত্যা করে প্রায় ১০ মাস তার মাংস খান আর্মিন মাইভাস। ২০০২ সালে তাকে গ্রে’ফতার করে পুলিশ। বিচারে তার যাব’জ্জীবন কারাদ’ণ্ড হয়।

৫. কম্বোডিয়া: ১৯৭০ সালের দিকে দেশটিতে গৃহযু’দ্ধের সময় অভিযোগ ওঠে, একদল সেনা আ’টক কয়েকজন খেমারুজ বি’দ্রোহীদের হৃদয় ও যকৃত কেটে বের করে নেয়। এবং পরে তারা শিবিরে ফিরে সেগুলি খায়।

৬. পাপুয়া নিউগিনি: দেশটির পশ্চিমে কোরোয়াই উপজাতির মানুষেরা প্রতিশোধ হিসেবে মানুষের মাংস খেয়ে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলটিতে এখনও এই সম্প্রদায়ের অন্তত ৩ হাজার মানুষ রয়েছে। এরা খাওয়ার মতো মানুষের সন্ধান না পেলে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের মাংসও খেয়ে থাকে।

এছাড়া পাপুয়া নিউগিনির দক্ষিণ ফোর এলাকার লোকেরা পঞ্চশের দশকেও মানুষের মগজ খেতো। অস্ট্রেলিয়ার সরকার নি’ষিদ্ধ ঘোষণার আগ পর্যন্ত ওরা ওদের মৃ’ত আ’ত্মীয়দের মগজ খেতো। অনেক সময় আশপাশের গোষ্ঠির সাথে যু’দ্ধে শত্রুপক্ষের যারা মা’রা যেত বা বন্দী হতো তাদেরকে খাওয়ার প্রথা ছিল।

ষাটের দশকে পাপুয়া নিউগিনির এসব লোকদের মধ্যে ‘কুরু’ (laughing sickness) নামের একটি রোগ ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। এ রোগ হলে আক্রা’ন্তদের প্রথমে নড়াচড়া ও কথা বলায় সমস্যা হতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা হাঁটা চলার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলে এবং শেষে মা’রা যায়।

রোগটার কারণ ঠিক পরিষ্কার ছিল না। তবে বোঝা যাচ্ছিল, যেসব এলাকায় মানুষখেকো প্রথা আছে সেসব এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি। আর তাই সত্তরের দশকে এক পর্যায়ে অস্ট্রেলীয় সরকার মানুষ খাওয়া নি’ষিদ্ধ করে দেয়। এর পরপরই রোগের প্রকোপ বন্ধ হয়ে যায়।

এবারও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে একই তথ্য। ম্যাড কাউ রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষক ডা. সিমন খুঁজে পেয়েছেন, ম্যাড কাউ এবং নিউগিনির কুরু রোগের লক্ষণ এবং পরিণতিতে মিল আছে। তার গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ম্যাড কাউ রোগাক্রা’ন্ত গরুর ম’স্তিষ্ক খেলেই ছড়ায় রোগটি। রোগটির চিকিত্‍সাও খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

পাপুয়া নিউগিনিতে যখন মানুষখেকো প্রথা ছিল তখন যারা কুরু রোগে আক্রা’ন্ত মানুষ খাওয়ার পরও আক্রা’ন্ত হয় নি এবং এখনো বেঁচে আছে, তাদের জিন পরীক্ষা করে দেখা গেছে এদের জিনের মধ্যে ম্যাড কাউ রোগের প্রতিষে’ধক আছে। মানুষ খাওয়ার কারণেই তাদের মধ্যে এই জিনটি তৈরি হয়েছে।

মজার বিষয় হচ্ছে, শুধু তাদের মধ্যেই নয়, পৃথিবীর সব মানুষের জিনেই এর অস্তিত্ব আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নিউগিনিতে যারা মানুষ খায় তাদের না হয় এসব জিনের দরকার আছে। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী আমাদের সবার মধ্যে এই জিনের উপস্থিতি কেন? আমরা তো মানুষ খাই না। যেসব জিন ব্যবহার হয় না তারা সাধারণভাবে সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যায়। এ গবেষণাটি করতে গিয়েই বেরিয়ে এসেছে আরো অদ্ভূত একটি তথ্য।

আমাদের মধ্যে কেন ম্যাড কাউ প্রতিরোধকারী জিন- বিষয়টি গবেষণা করতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পৃথিবীতে জাতি বর্ণ নির্বিশেষে (কেবল জাপানীরা ছাড়া, তাদের অন্য জিন আছে) সবার মধ্যে কুরু জাতীয় রোগ প্রতিরোধকারী জিনের উপস্থিতির কারণ হতে পারে যে আমাদের পুর্বপুরুষরা নিকট অতীতেও (১৫ হাজার বছর আগে) মানুষের মাং’স খেতো।

মানুষ খাওয়ার চর্চা আমাদের মধ্যেও ভালোভাবেই ছিল। যদিও এখন মেনে নিতে ক’ষ্ট হয়। আসলে আমাদের ভেতরের মানুষখোকো মানুষটা এখনো ঠিক মরে যায় নি। সংষ্কার আর সভ্যতার চাপে হয়তো আপাতত লুকিয়ে আছে। তো মানুষ খেকো মানুষ কারা? এক অর্থে সুযোগ পেলে আমরা সবাই।

সূত্র: সময় নিউজ।