রশিদ খানের ছেলে বেলা

ক্রিকেটে আফগানদের উত্থান যদি চমক জাগানিয়া হয়, তবে রশিদ খানের উত্থান রূপকথার মতো। আফগানিস্তানের সদ্য কৈশোর পার করা এই যুবা দাপট দেখাচ্ছেন পুরো ক্রিকেট বিশ্বে। দুর্দান্ত লেগস্পিনে তিনি নাস্তানাবুদ করছেন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের। ছোট দলের বড় তারকা হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই লেগ স্পিনার বোলিংয়ের সাথে দলের প্রয়োজনে ব্যাটিংটাও বেশ ভালোই করতে পারেন। অনেকেই এই লেগ স্পিনারকে পরবর্তী শেন ওয়ার্ন হিসেবেও সম্বোধন করা শুরু করেছেন।

২০১৫ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা রশিদ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সফল ক্রিকেটারদের একজন। অল্প সময়েই নিজেকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যাওয়া এই ক্রিকেটারের জানা অজানা ১০টি চমকপ্রদ তথ্য নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

১. রশিদের ছেলেবেলা-: আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা নঙ্গরহারে ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন রশিদ খান। খুব অল্প বয়সেই রশিদকে যুদ্ধকবলিত আফগানিস্তান ছেড়ে পাকিস্তানে পালাতে হয়েছে পরিবারের সাথে। তবে পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা হয়নি রশিদের পরিবারের। অল্পদিন থেকেই আবার ফিরে আসতে হয়েছে আফগানিস্তানে। রশিদ এবং তার আরও ১০ জন ভাইবোনকে নিয়ে পরবর্তীতে তার পরিবার আফগানিস্তানের জালালাবাদে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিশোর বয়সেই আফগানিস্তানে যুদ্ধের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করা এই ক্রিকেটার নতুন করে আফগানিস্তানেই শুরু করেন নিজের পথচলা। বাড়ির আঙিনায় আট ভাই মিলে ক্রিকেট খেলতেন টেনিস বলে টেপ পেচিয়ে।

২. জাতীয় দলে রশিদ-: মাত্র ১৭ বছর ৩৬ দিন বয়সেই রশিদ খান আফগানিস্তানের টি-টোয়েন্টি দলে অভিষিক্ত হন। এটি আফগানিস্তান জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে মাঠে নামার রেকর্ড। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে আফগানিস্তানের ওয়ানডে দলেও জায়গা করে নেন এই স্পিনার। বর্তমানে রশিদ খান আফগানিস্তান দলের অন্যতম অপরিহার্য সদস্য।

৩. বয়সভিত্তিক দলে রশিদ-: ২০১৬ সালে ১৮ বছর বয়সে ‘অনূর্ধ্ব ১৯’ ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তান দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান রশিদ খান। নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আগাম ইঙ্গিত সেই বিশ্বকাপেই দিয়েছিলেন এই আফগান যুবা। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সেবারের অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে নবীন উল হক এবং করিম জানাতের সাথে যৌথভাবে আফগানিস্তানের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক হন রশিদ। সেই বিশ্বকাপে ৬টি ম্যাচে মাঠে নেমে শিকার করেছিলেন ১০টি উইকেট। অসাধারণ এই পারফরম্যান্সের সুবাদে রশিদ খেলেছিলেন ভারতে অনুষ্ঠিত ২০১৬ সালের আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও। ক্রিকেট ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এভাবে বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময়ই মূল দলে খেলার সুযোগ পেয়েছেন।

৪. জাতীয় দলে অভিষেক-: মাত্র ১৭ বছর বয়সে জাতীয় দলের হয়ে রশিদ খানের আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে অভিষেক ঘটে। নিজের টি টোয়েন্টি অভিষেকের মাত্র ৭ দিন পর ওয়ানডেতেও অভিষিক্ত হওয়ার সুযোগ পান রশিদ। জিম্বাবুয়ের সাথে ২০১৫ সালে নিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচটি খেলেন এই ক্রিকেটার। অভিষেক ম্যাচে জিম্বাবুয়ের ১টি উইকেট তুলে নিয়ে ভূমিকা রাখেন আফগানিস্তানের জয়ে। আর অভিষেকের পর বাজে ফর্মের কারণে দল থেকে কখনোই বাদ পড়েননি এই ক্রিকেটার।

৫. রেকর্ড-: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই রেকর্ড বইয়ের খাতায় বেশ কিছু রেকর্ড নিজের নামে করেছেন তিনি । রশিদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রেকর্ড হলো, মাত্র ৪৬ ম্যাচে ১০০ উইকেট নিয়ে তিনি মিচেল স্টার্কের ৫২ ম্যাচে ১০০ উইকেট শিকারের রেকর্ড ভেঙ্গেছেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে আইসিসির ওয়ানডে এবং টি টোয়েন্টি বোলার র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠার রেকর্ড গড়েন রশিদ খান।সবচেয়ে কম বয়সে ২০১৭ সালে আইসিসির সহযোগী দেশের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব জেতেন। প্রথম কোনো খেলোয়াড় হিসেবে টি টোয়েন্টিতে মাত্র ২ ওভারেই ৫ উইকেট শিকারের রেকর্ড গড়েন এই আফগান ক্রিকেটার। ২০১৭ সালে ৬০ উইকেট শিকার করে আইসিসির কোনো সহযোগী দেশের হয়ে এক বছরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড তার দখলে।

৬. আফ্রিদি ভক্ত-ঃ ছোটবেলায় টিভিতে আফ্রিদির খেলা দেখে আফ্রিদির বোলিংকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন রশিদ। তার বোলিং আ্যকশনও অনেকটা আফ্রিদির মতোই। মজার ব্যাপার, রশিদ খান শুরুর দিকে উইকেট পেলেও আফ্রিদির মতো অঙ্গভঙ্গিমা করে উদযাপন করতেন। আফ্রিদিকে অনুকরণ করতেন বলে ‘আফগানিস্তানের আফ্রিদি’ হিসেবেও অনেকে তাকে সম্বোধন করে।

৭. অধিনায়কত্ব-ঃ সবচেয়ে কম বয়সে জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করার রেকর্ড রশিদের দখলে। আইসিসি ওয়ার্ল্ডকাপের একটি কোয়ালিফাই ম্যাচে অধিনায়কত্ব পাওয়ার সময় রশিদের বয়স ছিলো মাত্র ১৯ বছর ১৬৫ দিন।

৮. সেরা বোলিং ফিগার-ঃ আইসিসির সহযোগী রাষ্ট্রের হয়ে ওয়ানডেতে সেরা বোলিং ফিগার এখন রশিদের। ২০১৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে একটি ওয়ানডে ম্যাচে ১৮ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট শিকার করেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে এটি চতুর্থ সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড।

৯. আইপিএলে সাফল্য-ঃ একসময় কাবুল ইগলসের হয়ে আফগানিস্তানের স্থানীয় ক্রিকেটে অংশ নেয়া রশিদ খানের সাথে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের চুক্তি রয়েছে। ২০১৭ সালে নিজের প্রথম আইপিএলে ১৪ ম্যাচে ওভার প্রতি ৬ রানের একটু বেশি খরচ করে শিকার করেছিলেন ১৭ উইকেট। হায়দ্রাবাদ ২০১৭ সালে ৪ কোটি রুপিতে চুক্তি করলেও ২০১৮ সালের আইপিএলের নিলাম টেবিলে ৯ কোটি রুপি খরচ করে রশিদের সাথে চুক্তির মেয়াদ বাড়ায় ক্লাবটি ।

১০. প্রথম হ্যাটট্রিক-ঃ সিপিএলে ২০১৭ সালে প্রথমবার খেলার সুযোগ পেয়ে গায়ানা আমাজন ওয়ারিয়র্স দলের জার্সিতে হ্যাটট্রিকের দেখা পান এই লেগ স্পিনার। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এটিই প্রথম হ্যাটট্রিক।