স্মরণকালের ভ’য়াবহ যত বন্যায় প্লাবিত হয়েছে দেশ

নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশের বছর কাটে ছয়ঋতুর দোলাচলে। তবে এখন ষড়ঋতুর দেখা না মিললেও গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত ঠিকই উপভোগ করতে পারে দেশবাসী। তবে ভারি বর্ষণে দেশে সৃষ্টি হয় বন্যার। এ যাবতকালে বেশ কয়েকবার এমন ভ’য়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশ। সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকে বর্ষা।

এই সময় প্রধান নদী ও উপনদীগুলো হিমালয়ের বরফ গলা ও বৃষ্টির কারণে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। ফলে বন্যায় প্লাবিত হয় নিচু অঞ্চলগুলো। এ বছর বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি দেখে অভিজ্ঞদের মতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়া’বহ বন্যা হবে।

ভৌগলিক অবস্থান, ভূতাত্তিক গঠন ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ছোট বড় প্রায় ২৩০ টি নদী বয়ে গেছে। মূলত এজন্যই অন্যান্য প্রাকৃতিক দু’র্যোগের তুলনায় বাংলাদেশে বন্যার প্রকোপ বেশি।

এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ অঞ্চল তলিয়ে গেছে পানির নিচে। আগস্টের আগে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগেও দেশ পড়েছে ভয়াবহ বন্যার কবলে। চলুন জেনে নেয়া যাক সে সময়গুলোর বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে। সব হারিয়ে পথে বসেছিল লাখো মানুষ।

১৯৮৭ সালের বন্যা

১৯৮৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বন্যায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। প্রায় ৫৭ হাজার ৩০০ বর্গ কি.মি. এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পুরো দেশে। এটি ছিল সমগ্র দেশের ৪০ শতাংশ এরও অধিক এলাকা। এ ধরনের বন্যা ৩০ থেকে ৭০ বছরে একবার ঘটে। দেশের ভেতরে এবং বাইরে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতই ছিল এই বন্যার প্রধান কারণ। ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিমাঞ্চল, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র একীভূত হওয়ার নিচু অঞ্চলগুলো খুলনার উত্তরাংশ এবং মেঘালয় পাহাড়ের সংলগ্ন অঞ্চল বন্যা কবলিত হয়।

১৯৮৮ সালের বন্যা

স্মরণকালের ভয়া’ভহ বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৮৮ সালের বন্যা। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ডুবে যায়। স্থানভেদে এই বন্যা ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এটি ছিল এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষয়-ক্ষতিময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই বন্যায় বাংলাদেশের প্রায় ৮২ হাজার বর্গ কি.মি. (সমগ্র দেশের ৬০ শতাংশেরও অধিক) এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমেও সেই সময় এই দুর্যোগটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ ককরে। এই প্রলয়ংকারী বন্যাটি সংগঠিত হওয়ার মূল কারণ ছিল সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত। একই সময়ে মাত্র তিন দিনের বৃষ্টিপাত ও দেশের তিনটি প্রধান নদীর পানি প্রবাহ বেড়ে যাওয়াই ছিল এই বন্যার কারণ। রাজধানী ঢাকা শহরও প্লাবিত হয় এই বন্যায়।

১৯৯৮ সালের বন্যা

১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল বাংলাদেশে সংঘটিত ভ’য়ংকর বন্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। দুই মাসেরও বেশি সময়জুড়ে সংঘটিত এই বন্যায় দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যায়। এই ভ’য়ংকর বন্যাটি সংগঠিত হওয়ার মূল কারণ ছিল সারা দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত। সেইসঙ্গে একই সময়ে দেশের প্রধান তিনটি নদীর পানি প্রবাহ। ব্যাক ওয়াটার এ্যাফেক্টের কারণে এই বন্যা ঘটে।

২০০০ সালের বন্যা

ভারতের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের পাঁচটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বন্যায় বিধ্বস্ত হয় এই সময়। প্রায় ৩০ লাখ লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে। বন্যাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মাটির বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে ঘটেছিল।

২০০৪ সালের বন্যা

বন্যা হয়েছিল ২০০৪ সালের জুলাই মাসে। এতে বাংলাদেশের ৩৮ শতাংশ এলাকার ৫৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়।

২০০৭ সালের বন্যা

২০০৭ সালের বন্যাকে বলা হয় স্মরণকালের মহাপ্লাবন। এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বন্যা হয়। এই সময় দেশের ৪২ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। মোট আয়তনের ৬২ হাজার ৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত

২০১৭ সালের বন্যা

১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যাকে দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা বলা হলেও ২০১৭ সালের বন্যা ছিল খুবই ভয়াবহ। যদি এলাকা ভিত্তিকভাবে বলা হয়, তাহলে একে অতি ভয়াবহ বলা যায়। দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই বছর শুধু আমাদের দেশেই নয় একই মাত্রায় বন্যা দেখে দিয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানে।

এগুলো ছাড়াও ১৭৮১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩৫ বারেরও বেশি বন্যার কবলে পড়েছে। সেইসঙ্গে অন্যান্য প্রাকৃতিক দু’র্যোগ তো রয়েছেই- ঘূর্ণিঝড়, সাই’ক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি।-ডেইলি বাংলাদেশ