এই প’ঙ্গুত্বের দায় কার?

‘পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে বগুড়ার সিলিমপুর মাদলায় যাই ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে। বিদ্যুৎ লাইনে কাজ করছিলাম। হঠাৎ ১১ হাজার ভোল্টের তারে হাত দিতেই আমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। সঙ্গে সঙ্গে আমি জ্ঞান হারাই। যখন জ্ঞান ফেরে, দেখি আমার এক হাত নেই। হাতটি কেটে ফেলা হয়।’ এভাবেই কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার চন্দনপাঠ গ্রামের ফারুক হোসেন। তিনি আরও জানান, দু’র্ঘটনার পর থেকে কেউ সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি।

শুধু ফারুক নন, একই গ্রামের বাদশা মিয়া, এনামুল, বাবু, জাহিদুল, দছিবরেরও একই পরিণতি হয়েছে। তাদের কারও হাত-পা দুটোই কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কারও দুই হাত কেটে ফেলা হয়েছে। এখন তারা বাড়িতেই অতিক’ষ্টে দিনাতিপাত করছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে তাদের কারও খোঁজখবর রাখে না কেউ।পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া একই গ্রামের বাদশা মিয়া জানান, চলতি বছরের প্রথমদিকে পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার বিটঘর কাইতলা এলাকায়।

সেখানে লাইন চালু রেখেই ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তারের সংযোগ লাগাতে বলা হয়। বারবার বলেছি, লাইন বন্ধ করুন। ঠিকাদার বললেন, কাজ করো। চাপের মুখে সংযোগ স্থাপনের জন্য ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তারে হাত দিই। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎস্প’র্শে খুঁটিতে ঝুলে যাই। ঝুলে থাকা অবস্থায় ঠিকাদার পালিয়ে যান। পরে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করে আমাকে উ’দ্ধার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। প্রাণে বাঁচলেও দুটি হাত কেটে ফেলতে হয় আমার। এখন প্রতিব’ন্ধী হয়ে বেঁচে আছি। ঠিকাদারের ভুলে চিরতরে প’ঙ্গু হয়ে গেলাম আমি।

বাদশা আরও জানান, বিয়ের ছয় মাস না যেতেই অধিক বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলেন প্রতিবেশী পল্লী বিদ্যুতের ঠিকাদার সোহরাব এন্টারপ্রাইজের মালিক মোখলেছুর রহমান। পল্লী বিদ্যুতের কাজে বাদশাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বিটঘর কাইতলা এলাকায় নিয়ে যান মোখলেছুর রহমান। কী কাজ করতে হবে কোনো ধারণা না দিয়েই বাদশাকে পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে বলা হয়। এরপর জীবিকার তাগিদে পল্লী বিদ্যুতের কাজ শুরু করেন তিনি। নেই কোনো অভিজ্ঞতা, নেই দক্ষতা। ঠিকাদার যেভাবে বলেন সেভাবে বিদ্যুতের কাজ করতে হয়। কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ আছে কিনা জানতে চাইলে ঠিকাদার গালাগাল করেন। বাদশা বুঝে গেছেন, ঠিকাদারের কাছে কর্মীদের জীবনের কোনো মূল্য নেই।

এ পর্যন্ত বাদশা মিয়ার মতো একই অবস্থা সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের চন্দনপাঠ গ্রামের প্রায় ৩০ ব্যক্তির। ঠিকাদারের হয়ে পল্লী বিদ্যুতের কাজ করতে গিয়ে প’ঙ্গু হয়েছেন তারা। মেসার্স সোহরাব এন্টারপ্রাইজের মালিক ঠিকাদার মোখলেছুর রহমান বলেন, বাদশার বিষয়টি মী’মাংসার চেষ্টা চলছে। এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি মী’মাংসা করা হবে। তবে দু’র্ঘটনার দিন বিদ্যুতের লাইন বন্ধ না করার জন্য ঠিকাদার দায়ী নন। ঠিকাদারের কাজে নিযুক্ত সুপারভাইজার ও শ্রমিক সরদারের বিষয়টি দেখার কথা ছিল। ঠিকাদারের কাজে নিযুক্ত সুপারভাইজার মাহিদুল ইসলাম বলেন, সেদিন ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না। পরে শুনেছি বাদশা দু’র্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

শ্রমিক সরদার সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমরা লাইন বন্ধ করার অবেদন দিয়ে কাজ শুরু করেছি। কাজ চলা অবস্থায় দু’র্ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি মী’মাংসার জন্য একাধিকবার সালিশ করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। ঠিকাদার বিষয়টির মী’মাংসা করছেন না। সাঘাটার কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলজার রহমান বলেন, আমার ওয়ার্ডে হাত-পা হারানো ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। তাদের বেশিরভাগই পল্লী বিদ্যুতের কাজে গিয়ে দু’র্ঘটনায় পড়ে হা-পা হারিয়েছেন। এখন প্রতিব’ন্ধী হয়ে দিন কাটছে তাদের। ভবিষ্যতে আর কেউ যেন দু’র্ঘটনায় না পড়েন সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাই। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ঠিকাদারের বিরু’দ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

অভিজ্ঞতা ছাড়া ঠিকাদারের লোকজন বিদ্যুতের কাজ করতে পারবে কিনা জানতে চাইলে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোনারপাড়া জোনাল অফিসের এজিএম আব্দুল হালিম বলেন, আমরা পল্লী বিদ্যুতের যে কোনো কাজ টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিই। নতুন সংযোগ বা ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের জন্য পল্লী বিদ্যুতের নির্দিষ্ট ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। নিয়মব’হির্ভূতভাবে কাজ করতে গিয়ে কোনো দু’র্ঘটনা ঘটলে তার জন্য ঠিকাদার দায়ী থাকবেন। যেহেতু টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়, সেহেতু দু’র্ঘটনার দায় নেবে না পল্লী বিদ্যুৎ।

সূত্র: সমকাল।