মেয়ের বৃত্তির টাকায় কেনা চারটি গরু চুরি, কাঁদছেন দিনমজুর বাবা

বৃত্তি আর টিউশনি টাকা দিয়ে দিনমজুর বাবাকে চারটি গরু কিনে দিয়েছিলেন দুই বোন। আদর-যত্নে গরুগুলো বড় করে তোলেন বাবা। অভাবের সংসারে চারটি গরু কিছুটা হলেও সচ্ছলতা ফেরাবে, এমনই স্বপ্ন ছিল পরিবারের। কিন্তু এক রাতেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মঙ্গলবার রাতে দিনমজুর আনিসুর রহমানের গোয়ালঘর থেকে চারটি গরু নিয়ে গেছে চোর। একসঙ্গে গরুগুলো চুরি হওয়ায় কাঁদছেন বাবা। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন মেয়েরা।

অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা। ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার কামাত কাজলদিঘী ইউপির ঘটবর গ্রামে। জানা গেছে, ১০ শতাংশের ভিটেমাটি আর চারটি গরু ছিল আনিসুর রহমানের সম্পদ। তার চার মেয়ে। মেধাবী মেয়েরাই সম্পদ না থাকার দুঃখ দূর করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু চোর সব শেষ করে দিলো। রাতে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েন আনিসুরসহ পরিবারের সদস্যরা। ফজরের নামাজ পড়তে উঠে তার স্ত্রী আয়েশা বেগম দেখতে পান গোয়ালঘরে গরু নেই। চিৎকার করতেই চারপাশের লোকজন জড়ো হন।

আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও একটি গরুরও সন্ধান পাননি তারা। তাদের ধারণা, রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তালা ভেঙে গরুগুলো সংঘবদ্ধ চোরেরা পিকআপে নিয়ে গেছে। আনিসুর রহমান জানান, রাতে তিনিসহ পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে নামাজ পড়তে উঠে তার স্ত্রী আয়েশা বেগম দেখেন গোয়ালঘরে কোনো গরু নেই। তিনি চিৎকার করতেই আশপাশের সবাই এসে জড়ো হন। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও গরুর সন্ধান পাননি।

তিনি বলেন, আমার মেয়েরা বৃত্তি আর টিউশনি টাকা দিয়ে চারটি গরু কিনে দিয়েছিলো। সেগুলো পালন করে এখন বড় করেছি। একটি বিদেশি গরুসহ চারটি গরুর বাজার মূল্য হবে প্রায় দুই লাখ টাকা। আশা ছিল গরুগুলো বিক্রি করে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও বিয়ের খরচ জোগাড় করবো। কিন্তু চোর সব স্বপ্ন ভেঙে দিলো। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

দিনমজুর আনিসুরের চার মেয়ে। চারজনই অত্যন্ত মেধাবী। বড় মেয়ে আফসানা খাতুন এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ইংরেজি বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন। মাস্টার্স পড়া অবস্থায় সম্প্রতি তার বিয়ে হয়েছে। মেজ মেয়ে রোমানা আক্তার এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি এখন রংপুর মেডিকেল কলেজে ডেন্টাল বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। তৃতীয় মেয়ে লাবণী আক্তার এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি এখন রংপুর ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএইচটি) রেডিওলোজি নিয়ে পড়াশোনা করছেন।

ছোট মেয়ে রিপা আক্তার পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। বড় মেয়ে আফসানা ইসলামী ব্যাংক থেকে মাসে তিন হাজার ও মেজ মেয়ে রোমানা ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক থেকে মাসে দুই হাজার টাকা করে শিক্ষা বৃত্তি পান। সেই টাকার সঙ্গে টিউশনির টাকা এবং দিনমজুরির জমানো কিছু টাকা যোগ করে বাবাকে চারটি গরু কিনে দেন তারা।

রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের শিক্ষার্থী রোমানা আক্তার বলেন, গরুগুলো আমরা কিনেছিলাম যেন বিপদের সময় বিক্রি করে চলতে পারি। এখন আমাদের আর কিছু রইলো না। সামনে আমার পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে ১২ হাজার টাকা লাগবে। সেই টাকা কোথায় পাব ভেবে পাচ্ছি না। বাবা বলেছিলেন গরু বিক্রি করে টাকা দেবেন। করোনার মধ্যে এমনিতে টানাপোড়েনে দিন যাচ্ছিল। এখন পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করাও অনিশ্চিত হয়ে গেল।

পঞ্চগড়ের এসপি মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, ওই পরিবারের চারটি গরু চুরির ঘটনা আমরা তদন্ত করছি। চোর চক্রটিকে ধরার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।-ডেইলি বাংলাদেশ