এবার চাল না দেওয়ায় বাতিল হচ্ছে মিলের লাইসেন্স

চলতি বোরো মৌসুমের চাল সংগ্রহের নির্ধারিত সময় আর ছয় দিন পরই শেষ হচ্ছে। এখনও অনেক মিল মালিক সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করেননি। এবার ব্য’র্থ চালকলগুলোর লাইসে’ন্স বাতিল করা হচ্ছে। এ ছাড়া অপরা’ধের ধরনভেদে চালকলগুলোকে অন্য শা’স্তি দিতেও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।

গত বুধবার খাদ্য অধিদপ্তর থেকে আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য নিয়’ন্ত্রকদের এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, চলতি মৌসুমে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও দেড় লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ৩১ আগস্ট ধান-চাল সংগ্রহের নির্ধারিত সময় শেষ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সংগ্রহের জন্য কিছুটা প্রতিকূল পরিবেশ রয়েছে। এ অবস্থার মধ্যেও যেসব চালকল মালিক সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছেন এবং চুক্তি অনুযায়ী সব চাল সরবরাহ করেছেন তাদের ইতিবাচক মূল্যায়ন করা হবে।

অন্যদিকে চুক্তি করার জন্য আদেশ দেওয়ার পরও যেসব চালকল মালিক তা মানেননি তাদের লাই’সেন্স প্রাথমিকভাবে স্থগিত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। যেসব মিল মালিক চুক্তি অনুযায়ী চাল সরবরাহে ব্য’র্থ হবে ও সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জনে অসহযোগিতা করেছেন, তাদের বিরু’দ্ধে চুক্তিপত্র ও চালকল লাই’সেন্স ইস্যু সংক্রা’ন্ত বিধিবিধানসহ আ’ইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ বলেন, সরকারি সংগ্রহ অভিযানে গুদামে চাল না দিলে অপরাধের ধরনভেদে শা’স্তি হবে। যারা চাল দেয়নি প্রাথমিকভাবে তাদের লাইসেন্স স্থগি’ত হবে। সরকারি গুদামে চাল না দিয়ে যারা রাষ্ট্রবিরো’ধী আচ’রণ এবং দেশের প্রতিকূল পরিবেশে সরকারকে অসহযোগিতা করে, সে অপরা’ধে তাদের লাই’সেন্স বাতিল হতে পারে। এ ছাড়া মিলের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে জামানত বাজেয়া’প্ত করা হতে পারে। সরকারের প্রণোদনা ঋণ সুবিধা থেকে এসব মিল বঞ্চিত হবে।

তিনি বলেন, গত মৌসুমগুলোতে কৃষকরা মার খেয়েছে। তখন এই মিল মালিকরা কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা মুনাফা করেছে। আর এখন রাষ্ট্রবিরো’ধী কার্যক্রম করছে। তবে একেক মিলের ক্ষেত্রে একেক রকম শা’স্তি দেওয়া হবে। আর যারা ভালো করেছে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। আগামী ৩১ আগস্টের পরে মিলগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সংগ্রহে যা ঘাটতি হবে তা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমদানি করে পূরণ করা হবে।

বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী বলেন, দেশে ৬০ শতাংশ হাসকিং মিল ও ৪০ শতাংশ অটোমিল রয়েছে। হাসকিং মিলগুলো চাল উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ পায়নি। এখনও অনেক চাতাল পানির নিচে। করোনা সংক্র’মণের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে না হতেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাল উৎপাদন করতে পারেনি তারা। এ জন্য সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে মিল মালিকদের আরও এক মাস সময় বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

লায়েক আলী বলেন, মিল মালিকরা চাল দিতে চান। এর পরে দিতে না পারলে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। তাছাড়া বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে যে পরিমাণ চাল সংগ্রহ বাকি থাকবে তা আমন মৌসুমে এই দরে সংগ্রহ করার সুযোগ চান তারা। সরকার করোনা ও বন্যার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা করেন। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে চাল না দিলে তার বিরূদ্ধে সরকার সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে দিতে না পারার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

জানা গেছে, সরকারের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে। চলতি বছর সরকার সাড়ে ১৯ লাখ টন বোরো ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের কাছ থেকে ১০ টন সিদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা কেজিতে দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ২৬ টাকা কেজিতে আট লাখ টন বোরো ধান কেনার সিদ্ধান্ত হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে মোট ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৩৯১ টন। এর মধ্যে ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪২৩ টন। আর চাল (সিদ্ধ) সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখ ৯০ হাজার ২৬৭ টন এবং আতপ চাল ৬৭ হাজার ৯২৯ টন। গুদামে ধান-চাল না আসায় সরকারের বোরো সংগ্রহের লক্ষমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শুল্ক্ক কমিয়ে চাল আমদানি করবে। এখন এ বিষয় পর্যালোচনা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

ধান-চাল সংগ্রহ মৌসুমের শুরুতেই মিল মালিকরা চুক্তিমূল্যে সরকারকে চাল সরবরাহ না করে গড়িমসি করেছে। তখন মিলাররা অবৈ’ধ মজুত করে বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্টো সরকারের চাল কেনার দর কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ দাবি নাকচ করে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

সূত্র: সমকাল।