যেয়ো না মেসি

সাত বছর বয়সে শিশুটি। বাড়ির বাইরে ফুটবল মাঠ ছাড়া কিছু চেনে না। তার বয়সি ছেলেগুলো যেমন বড় হয়ে উঠছিল, সে তেমনটা বাড়ছিল না। ডাক্তাররা দেখে বললেন—গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি। ছেলেটির খেলা দেখে অনেকেই পছন্দ করে, টাকা দিয়ে কিনতে চায়। কিন্তু তার বাবা-মা চান ছেলের চিকিত্সা। এই অবস্থায় স্কাউটরা তাকে নিয়ে এলো স্পেনে।

এক পলক ছেলেটির খেলা দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন কোচ-কর্মকর্তারা। হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে টিস্যু পেপারেই চুক্তি সই করিয়ে ফেললেন। সেই শুরু হলো এক ভালোবাসার সম্পর্ক—লিওনেল মেসি ও বার্সেলোনা। অবশেষে প্রায় দুই দশকের সেই সম্পর্কটা ভেঙে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। মেসি অন্তত বার্সেলোনাকে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর থাকতে চান না। এই অবস্থায় বিশ্ব জুড়ে মেসি ও বার্সেলোনা ভক্তদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। খোদ বার্সেলোনায় শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে শত শত সমর্থক স্লোগান দিচ্ছেন, যেও না মেসি।

মেসিকে থেকে যাওয়ার এই আহ্বানের পাশাপাশি চলছে ক্ষোভের প্রকাশ। সমর্থকরা মনে করছেন ক্লাবের সভাপতি জোসে মারিয়া বার্তেমেউয়ের কারণে ক্লাব ছাড়ছেন মেসি। তাই এই সভাপতির পদত্যাগ চেয়ে স্লোগানও দিচ্ছেন সমর্থকরা। যদিও বার্তেমেউ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করছেন না। তবে সভাপতি পদে আগামী নির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী ভিক্টর ফন্ট বলেছেন, সভাপতি পদত্যাগ করা ছাড়া মেসিকে ধরে রাখার কোনো উপায় নেই।

সবাই যে মেসির জন্য কাঁদছেন, তা অবশ্য নয়। ক্লাবটির সাবেক সভাপতি হুয়ান গ্যাসপ্রিট বলেছেন, ‘রিলিজ ক্লজ’-এ থাকা ৭০ কোটি ইউরোর এক টাকা কমেও মেসিকে ছাড়া ঠিক হবে না। তিনি মেসির দলের প্রতি নিবেদন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

মেসির সঙ্গে বর্তমান সভাপতির সমস্যা আজকের নয়। বলা হয়, মেসির আপত্তি সত্ত্বেও সর্বশেষ দুজন কোচকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ দলটির কোচ হয়েছেন রোনাল্ড কোম্যান। তিনি নাকি দায়িত্ব নেওয়ার পরই মেসির সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে বলেছেন, আগের মতো সুযোগ-সুবিধা মেসি আর পাবেন না। এর পাশাপাশি মেসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু লুই সুয়ারেজকে বিদায় বলে দিয়েছেন কোম্যান। ফলে মেসির ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করাটা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র।

এখানে মেসি একটা সুবিধা নিতে চাইছেন। তার সঙ্গে এখন বার্সেলোনার যে চুক্তি, সেখানে বলা আছে, প্রতি মৌসুমের শেষে মেসি চাইলে বিনামূল্যে অন্য কোনো ক্লাবে চলে যেতে পারবেন। ‘মৌসুম শেষ’ বলতে এখানে জুন মাসকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এবার মৌসুমটা শেষ হলো এই আগস্ট মাসে। ফলে মেসি দাবি করতে চাচ্ছেন, তিনি মৌসুম শেষেই ক্লাব ছাড়ছেন। কিন্তু ক্লাব পক্ষ বলছে, সেই সময়টা জুনে চলে গেছে। এখন যেতে গেলে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো দিতে হবে ক্লাবকে। এখানে একটা সমঝোতা না হলে আদালতে যেতে হতে পারে দুই পক্ষকে।

এখন এই বিপুল অর্থের সঙ্গে যোগ করুন মেসির মাসিক বেতন আবার প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থ ব্যয় করে মেসিকে কেনার সামর্থ্য কার আছে? আছে, কয়েকটা দলের আছে। বলা হচ্ছে, বিপুল অর্থ দিয়েই মেসিকে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে ফ্রান্সের ক্লাব পিএসজি, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার সিটি এবং ইতালির ইন্টার মিলান। এর সঙ্গে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও লড়াইতে যোগ দেবে বলে শোনা যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত এ সবই শোনা কথা। একটা কথাই নিশ্চিত যে, মেসি বার্সেলোনা ছেড়ে যেতে চাইছেন। আর এই ব্যাপারটিই কোনোভাবে মানতে পারছেন না স্পেনের কাতালোনিয়া প্রদেশের ক্লাবটির ভক্তরা। তাদের কাছে বার্সেলোনা স্রেফ একটা ক্লাব নয়; এটা সামাজিক আন্দোলনের ব্যাপার। আর এই আন্দো’লনের অংশ হিসেবেই তারা মেসিকে দেখে এসেছে। এখন এসে বিদায় জানাতে কিছুতেই রাজি নয় তারা।

ফলে মেসি যখন ব্যুরোফ্যাক্স বা সত্যায়িত বার্তা দিয়ে নিজের যাওয়ার খবর জানিয়েছেন, তারপর থেকেই ক্লাবের বাইরে চলছে আন্দোলন। সেখানে মুখে মুখে স্লোগান—থেকে যাও, মেসি।-ইত্তেফাক