ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনা

আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর ম্যারাডোনা। অনেকেই বলেন ফুটবলের ঈশ্বর। উপমহাদেশ বটেই সারা বিশ্বে আর্জেন্টিনার ভক্তের আজ যে উন্মাদনা তার স্রষ্টাও তিনি। তার হাত ধরেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভেসেছিল আর্জেন্টাইন ভক্তরা। ম্যারাডোনা নামের সঙ্গে জ’ড়িয়ে আছে আনন্দ-বেদনার বহু স্মৃতি। ফুটবল নৈপুণ্যে তিনি ছিলেন সেরাদের সেরা। মা’দক গ্রহণের কারণে বহি’ষ্কার হয়েছিলেন, কাঁদিয়েছিলেন ভক্তদের। নারী কেলে’ঙ্কারি ও নানা বিতর্ক তার নিত্যসঙ্গী তবুও তাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা এতটুকু কমেনি। জীবন্ত কিংবদন্তি ম্যারাডোনাকে নিয়ে আজকের আয়োজন—

বল বয় থেকে ফুটবলের শাহেনশাহ

আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসের লানুস ১৯৬০ সালে জন্ম নেন ম্যারাডোনা। দরিদ্র পরিবারে বেশ ক’ষ্টেই কেটেছে তার শৈশব। পড়াশোনা নয়, ফুটবলের প্রতিই ছিল তার নেশা। সারাক্ষণ বল নিয়ে পড়ে থাকতেন। ১০ বছর বয়সে এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলতে নামেন মাঠে। ‘দ্য লিটল অনিঅন’ পরে যার নাম রাখা হয় ‘আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স’— সেখানে একজন বল বয় হিসেবে তাকে নেওয়া হয়। অবসরে নিজেই মাঠের এক কোনায় বল নিয়ে কসরত করতেন, ড্রিবলিং করতেন আর তাতেই নজরে পড়ে যান ম্যারাডোনা।

১২ বছর বয়সে মাঠ দাপিয়ে বেড়ান আর্জেন্টিনার প্রথম বিভাগের খেলায়। তখন খেলার অর্ধ-বিরতি চলছিল। তিনি মাঠে নেমে নিজে থেকেই নানা রকম কৌশল দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। দর্শকরা তাকে নিয়ে হইহুল্লোড় শুরু করে দেয়, হাত তালির পাশাপাশি প্রশংসাতেও ভাসেন। ১৯৭৬ সালে ‘আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স’ এর নিয়মিত খেলোয়াড় হিসেবে ম্যারাডোনা তার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন।

ফুটবল জাদুকরের বাজিমাত

ম্যারাডোনাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলে অনেকেই মেনে নিয়েছেন। বাঁ পায়ে বল দখলে রাখতেন। দর্শকরা অনেকেই বিস্ময়ে দেখতেন, বল বুঝি তার পায়ে আঠা দিয়ে লাগানো! ছোট ছোট পা দিয়ে তিনি খুব দ্রুত দৌড়াতে পারতেন। খুব অল্প জায়গার মধ্যেই ঘুরে যেতে পারতেন। প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের পেছনে ফেলে একাই বল নিয়ে ঢুকে যেতেন ডি-বক্সে। ম্যারাডোনা ছিলেন একজন মিডফিল্ডার। মাঝ মাঠে দাঁড়িয়ে বল পেলেও ম্যারাডোনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ত প্রতিপক্ষ।

মিডফিল্ডার হয়েও ডিফেন্ডারের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। সতীর্থকে সামনে দিয়ে বল পাস করতেন যেন গোলপোস্টে আক্রমণ করা যায়। এ ছাড়া তার ড্রিবলিং বা কাটানোর দক্ষতা ছিল অবিশ্বাস্য। একাই দুই-চারজন খেলোয়াড়কে ফাঁকি দিয়ে বল পাস করে দিতেন। তার আরেকটি জাদুকরী নৈপুণ্য ছিল পায়ের পেছনের অংশ ব্যবহার করে এক ধরনের রিভার্স-ক্রস পাস শট। এছাড়া ফ্রি-কিকও নিতেন ভয়’ঙ্করভাবে।

ডোপ টেস্টে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার

১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয় ম্যারাডোনার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলেও ম্যারাডোনাভক্তরা ভুলবে না ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ধারণা। গ্রুপপর্বের প্রথম দুই ম্যাচে দুর্দান্ত খেলার পর হুট করেই শোনা গেল, ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার! ফিফা জানাল, তার শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হুট করে ম্যারাডোনার ডোপ টেস্ট ও তাকে নি’ষিদ্ধের ঘটনায় ফুটবল বিশ্ব রীতিমতো থমকে যায়। ক্ষো’ভে ফুঁ’সে ওঠে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। ম্যারাডোনা তার আত্মজীবনীতে ৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে ধরার বিষয়ে বলেছেন, তার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক তাকে এনার্জি ড্রিংক রিপ ফুয়েল দেওয়ার কারণে তিনি ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়েছেন।

তিনি পরিষ্কার দাবি করেন ওই রাসায়নিক দ্রব্যটি তার প্রশিক্ষক অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছিলেন। ম্যারাডোনাকে বহিষ্কারের ঘটনাকে তার ভক্তরা ষ’ড়য’ন্ত্র হিসেবেই মনে করেন। যদিও ম্যারাডোনার জীবনে মাদক গ্রহণে বহিষ্কারের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ফুটবল ক্লাব নেপোলিতে থাকা অবস্থায় ১৯৯১ সালেও একবার ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের জন্য ধরা পড়ায় ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ম্যারাডোনাকে। সে যাই হোক, ম্যারাডোনাবিহীন আর্জেন্টিনা নক আউট পর্বেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায়।

‘হ্যান্ড অব গড’ তারপর ছয়জনকে কাটিয়ে অবিশ্বাস্য গোল

১৯৮৬ বিশ্বকাপটা ছিল ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপেই বিশ্ববাসী ম্যারাডোনার কাছ থেকে দেখেছিল ইতিহাস কাঁপানো দুই গোল। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ডের। ম্যাচে দুই পক্ষের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। কিন্তু ম্যাচেন ৫১ মিনিটে লাফিয়ে উঠে গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক ম্যারাডোনা। গোল করার পরপরই ম্যারাডোনা তার সতীর্থদের সঙ্গে গোল উদযাপনে মেতে ওঠেন। অবশ্য ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনসহ চার-পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলার গোল বাতিলের দাবি জানিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন রেফারির দিকে। কিন্তু ব্যাপারটি রেফারি সত্যিই বুঝে উঠতে পারেননি।

পরে টেলিভিশন রিপ্লেতে দেখা যায়, গোলটি করার সময় ম্যারাডোনা হাত ব্যবহার করেন। ম্যারাডোনা পরে, এটি স্বীকার করে নিয়ে ‘হ্যান্ড অব গড’ বলে অভিহিত করেন। এই বিতর্কিত গোলের পর আরেক অবিশ্বাস্য গোলের সাক্ষী হয় দর্শকরা। বিতর্কিত গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই দ্বিতীয় গোল করেন এই আর্জেন্টাইন তারকা। যে গোলকে পরে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা গোল হিসেবে নির্বাচিত করে। মাঠের অর্ধেকের বেশি অংশ দৌড়িয়ে, একে একে পাঁচজন ইংরেজ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে গোল করেন ম্যারাডোনা। ২০০২ সালে ফিফা অনলাইনে ভোটের আয়োজন করলে এই গোলটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে নির্বাচিত হয়।

বিত’র্ক তার সঙ্গী

ম্যারাডোনা মানেই বিত’র্ক। সমালোচনার বিষয়ের অভাব নেই। হাত দিয়ে গোল করে সেটা স্বীকার করে হৈচৈ ফেলে দেন, ড্রাগ নিয়ে ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করেন, একাধিক গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কেলে’ঙ্কারি, সন্তান অস্বীকার, কখনো মিডিয়াতে এসে আর্জেন্টিনা বিদ্বে’ষী বক্তব্য, কখনো আবার ফিফার প্রধানকে গালাগা’লি— সব সময়ই বিত’র্কের সঙ্গে থাকা ম্যারাডোনা ফেঁসেছেন ট্যাক্স ফাঁ’কির মাম’লায়। এই কারণে দীর্ঘদিন ইতালিতে যেতে পারেননি ম্যারাডোনা। ইতালির পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল।

তার বিরু’দ্ধে ট্যাক্স কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তিনি ইতালিতে থাকা অবস্থায় যেসব ব্যবসা করেছেন, আয় করেছেন; তার কর সময়মতো শোধ করেননি। এ নিয়ে কম নাটক হয়নি। ২০০৭ সালে ম্যারা’ডোনা ইতালি সফরে গিয়ে হট্টগোল লাগিয়ে দেন। ইতালি বিমানবন্দরের পুলিশ তাকে আ’টকে দেয়। তার কাছ থেকে বেশ কিছু অর্থ ও দুটি রোলেক্স ঘড়ি খুলে রাখে। এটাই শেষ নয়। ২০০৯ সালে তখন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচ ছিলেন তিনি।

এক ক্লিনিকে কর-পুলিশ গিয়ে আবারও চড়াও হন তার ওপর। সেবার নগদ ৪ হাজার পাউন্ড ও কানের দুল কেড়ে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয় কর-পুলিশ। অবশ্য প্রতিবারই কর ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করে আসছিলেন। এ নিয়ে আদালত অবশ্য ম্যারাডোনারই পক্ষ নেয়। জানানো হয়, ম্যারাডোনার কর ফাঁকির কোনো প্রমাণ নেই।

বিশ্বকাপ জয়

নীল-আকাশি আর্জেন্টিনার সুখস্মৃতি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। এক ম্যারাডোনার জাদুতে বুঁদ ছিল পুরো বিশ্ব। একাই আর্জেন্টিনাকে উপহার দিয়েছিলেন বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড ও শতাব্দীর সেরা গোল দেখেছিল বিশ্ব। কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই শেষে আর্জেন্টিনা বেলজিয়ামকে পরাজিত করে টিকিট পায় ফাইনালের। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে বদ করে। আট বছরের ব্যবধানে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় শিরোপার দেখা পায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হন ম্যারাডোনা।

গোলের রাজা

আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর ক্লাব ফুটবলে ম্যারাডোনার অভিষেক ঘটে। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ক্লাবে খেলেন ম্যারাডোনা। এই ক্লাবের হয়ে ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন। ১৯৮১ সালে ১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা যোগ দেওয়ার পর ১৯৮২ সালে বোকা জুনিয়র্স প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন। এরপর ইউরোপে ছোটেন ম্যারাডোনা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের পর ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইউরোপিয়ান ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দেন তিনি।

১৯৮৩ সালে ম্যারাডোনা রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে কোপা দেল রে এবং অ্যাথলেটিক বিলবাওকে হারিয়ে স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় করে। বার্সেলোনার হয়ে ৫৮ খেলায় ৩৮টি গোল করেন ফুটবল জাদুকর। ১৯৮৪ সালে ৬.৯ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিয়ের বিনিময়ে বার্সেলোনা থেকে ইতালির ক্লা নেপোলিতে যোগ দেন ম্যারাডোনা।

নেপোলির বিস্ময়

ম্যারাডোনা যখন নেপোলিতে যোগ দেন লিগে তখন নেপোলির অবস্থা খুব বেশি ভালো ছিল না। সেই অবস্থা থেকে ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে সিরি এ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে এবং ১৯৮৯-৮৮ ও ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে তারা রানার-আপ হয়। শুধু তাই নয় ১৯৮৭ সালে কোপা ইতালিয়াও জিতে নেপোলি। এ ছাড়া ১৯৮৯ সালে রানারআপ হয়। নেপোলির হয়ে ম্যারাডোনা ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমের সিরি এ-তে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।

আর্জেন্টিনার হয়েও ম্যারাডোনার ক্যারিয়ার যে কাউকে বিস্মিত করবে। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ম্যারাডোনা টানা চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বকাপ জেতেন ১৯৮৬ সালে। তবে এর আগে ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুরুয়ারি ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়। আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৭৯ সালে যুব বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে এবং সেই বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়।

নারী কেলে’ঙ্কারি

নারী কেলে’ঙ্কারিতে জড়িয়ে ম্যারাডোনা বারবার শিরোনাম হয়েছেন। ১৯৮৪ সালে ক্লদিয়াকে বিয়ে করেন ম্যারাডোনা। তবে সে ২০ বছর পর ২০০৪ সালে ক্লদিয়ার সঙ্গে ম্যারাডোনার বৈবা’হিক সম্পর্কের ইতি ঘটে। ম্যারাডোনা ও ক্লদিয়ার সংসারে রয়েছে দালমা ও জিয়ান্নিনা নামে দুই মেয়ে। এ তো গেল। তার গার্লফ্রে’ন্ডের সংখ্যা কম নয়। বিয়ের পরই ক্রিস্টিনা সিনাগ্রা নামে এক ইতালীয় তরুণীর প্রেমে পড়েন তিনি। সিনাগ্রার গ’র্ভে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। তবে ডিয়োগো সিনাগ্রাকে ম্যারাডোনা প্রথমে স্বীকার করেনি।

২০১০ সালে ম্যারাডোনার জীবনে আসে ভেরোনিকা ওজেদা নামে এক আর্জেন্টাইন মডেল। এখানে জন্ম নেওয়া সন্তান নিয়েও ম্যারাডোনা যথেষ্ট বিত’র্ক সৃষ্টি করেন। ভেরোনিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই রোসিও ওলিভা নামে নতুন এক নারী আসে ম্যারাডোনার জীবনে। ম্যারাডোনার অর্ধেক বয়সেরও কম বয়সী ওলিভার সঙ্গে ম্যারাডোনার প্রে’ম রসায়ন জানা যায় ২০১০ সালে। (অনলাইন থেকে সংগৃহীত)