বিশ্বজয়ী ১০ মুসলিম তারকা

আম্মানে অবস্থিত জর্ডানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘দ্য রয়েল ইসলামিক স্ট্যাটিজিক স্টাডিজ সেন্টার’ প্রতি বছর ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস ফাইভ হানড্রেড মোস্ট ইনফ্লুনসিয়াল মুসলিমস’ শিরোনামে সারাবিশ্বের প্রভাবশালী ও খ্যাতনামা মুসলিম ব্যক্তিত্বদের তালিকা প্রকাশ করে থাকে। দীর্ঘ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে তারা এই তালিকা তৈরি করে। এ তালিকাটি ৫০০ মুসলিম নামেও পরিচিত। সে ধারাবাহিকতায় তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ২০২০ সালের প্রকাশনায় বিশ্বের সর্বাধিক প্রভাবশালী সেরা ১০জন মুসলিম তারকার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। চলুন সংক্ষেপে জেনে নেই তাদের নির্ঘণ্ট ও পরিচয়-

১. হাশিম আমলা: হাশিম মোহাম্মদ আমলা। নাটাল প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। ডানহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি প্রথমদিকে ব্যাটিং করেন এবং মাঝে মাঝে মিডিয়াম পেস বোলিং করে থাকেন। আইসিসি প্লেয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে টেস্ট ও একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট- উভয় বিভাগে বিশ্বের ১নং ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃত এই ক্রেকেটার। তার মুখভর্তি ঘনকালো লম্বা দাড়ি মুসলিমদের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। হারাম থেকে বেঁচে থাকতে এবং হালাল পণ্য ব্যবহার করতে ভক্তদের উদ্বুদ্ধ করেছেন সবসময়। এস কারণে অনেকসময় বর্ণবাদের শিকার হলেও পিছু হটেননি তিনি। সবসময় নিজেকে একজন মুসলিম হিসেবেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও বিশ্বজুড়ে মুসলিম যুবকদের আইডল মানা হয় আমলাকে।

২. মোহাম্মদ আসফ: মোহাম্মদ আসাফ ফিলিস্তিনের মানুষ একজন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী। তার গানে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিমদের দু:খ-দুর্দশার কথা শোনা যায়। তিনি জনপ্রিয় টিভি প্রোগ্রাম ‘আরব আইডল ২০১৩’ সালে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। (Raise Your Keffiyeh) নামে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী একটি গান গেয়ে তিনি বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের নজড় কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। তাকে ফিলিস্তিনি যুবকদের কণ্ঠস্বর বলা হয়ে থাকে। ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল অথরিটি কর্তৃক তাকে সংস্কৃতি ও কলা বিষয়ক রাষ্ট্রদূত হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে।

৩. মোহাম্মদ ফারাহ: এখন পর্যন্ত সর্বাধিক সফল ব্রিটিশ ক্রীড়াবিদ। ফারাহ ২০১২ এবং ২০১৬ অলিম্পিক গেমসে ৫০০০ মিটার এবং ১০০০০ মিটারের পাশাপাশি ৬ টি অন্যান্য ক্যাটাগরিতে স্বর্ণপদক জিতেছে। সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও ১৮ বছর বয়স থেকে যুক্তরাজ্যে তার বেড়ে ওঠা। ফারাহ তার কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনসাধারণের হৃদয় আকর্ষণ করেছেন। তিনি বিশ্বজুড়ে বিশেষত মুসলিম বিশ্বের মানুষের পক্ষে অনুসরণ করার জন্য জনপ্রিয় রোল মডেল।

৪.নাদিয়া হুসেইন: বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক নাদিয়া হুসেইন। একজন কলামিস্ট, লেখক, টেলিভিশন উপস্থাপিকা, সর্বাধিক বিখ্যাত ব্রিটিশ বেকার এবং শেফ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত তিনি। রান্না বিষয়ক ব্রিটেনের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি ‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ প্রতিযোগিতা যেখানে ২০১৫ সালে চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ী হন নাদিয়া হুসেইন। পরের বছর রানি এলিজাবেথের নব্বই-তম জন্মবার্ষিকীর কেক তৈরি করে মিডিয়ার নজর কাড়েন নাদিয়া হুসেইন। খ্যাতনামা একটি ব্রিটিশ পত্রিকা তাকে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী ৫০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ বিজয়ী হওয়ার পর তিনি ‘নাদিয়া’স ব্রিটিশ ফুড অ্যাডভেঞ্চার’সহ অন্যান্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। তাকে প্রায়ই বর্ণবাদের শিকার হতে হয়। প্রকাশিতব্য আত্মকথা ‘ফাইন্ডিং মাই ভয়েস’-এ সব কথা বলেছেন বৃটেনে ‘বেস্ট লাভড’ সেলিব্রেটি শেফ নাদিয়া।

৫. উ লেই: চাইনিজ সুপার লিগের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নজর কেড়েছিলেন। এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ চীনে এখন মেসি সুয়ারেজদের কদর নেই তেমন। আর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছেন একজন চীনা তারকা। সর্বশেষ দলবদলে চীনা তারকা উ লেই কে দলে এনেছে এসপানিওল। চীনের এই উইঙ্গার চাইনিজ সুপার লিগের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে চীনের পেশাদার লিগে ম্যাচ খেলার কৃতিত্বও আছে তার। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে উ লেইয়ের অভিষেকের দিন প্রায় ৪০ মিলিয়ন চীনা দর্শকের চোখ ছিল টিভি পর্দায়।

৬. খাবিব নুর মোহাম্মদভ: ইউএফসি’র ইতিহাসে প্রথম মুসলিম চ্যাম্পিয়ন। এছাড়া তিনি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ম্যাচে অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মিক্সড মার্শাল আর্টিস্ট খাবিব রাশিয়ার অর্ন্তভুক্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব দাগেস্তানের আভার মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গত ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত মিক্সড মার্শাল আর্টসের (এমএমএ) বৃহত্তম আসর আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপের (ইউএফসি) ফাইনাল ম্যাচে আইরিশ প্রতিযোগী কনর ম্যাকগ্রেগরকে পরাজিত করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এ রাশিয়ান। খাবিব আভারি, আরবি, তুর্কি, রুশ ও ইংরেজিতে পারদর্শী। পিতার হাত ধরেই তিনি প্রথম কুস্তির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে মিক্সড মার্শাল আর্টে খাবিবের ক্যারিয়ারের সূচনা হয়।

৭. পল পগবা: পল পগবা হলেন একজন ফরাসি ফুটবলার। তিনি প্রিমিয়ার লীগের দল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলে খেলে থাকেন। ২০১৪ সালে তিনি জুভেন্টাস থেকে ম্যান ইউটিউডে £৮৯ মিলিয়ন ডলারে পাগবা হয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই ফুটবলার। প্রতিভাবান মিডফিল্ডার তিনি ফ্রান্সের ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ের অংশ ছিলেন এবং ফাইনালে গোল করেছিলেন। পোগ্বা গিনির পিতা-মাতার কাছে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ইউরোপীয় মুসলিম ফুটবল খেলোয়াড় যিনি বিশ্বের সেরাদের মধ্যে স্থান পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ৫ কোটিরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে। তিনি প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মক্কায় তার সফরের ছবি শেয়ার করে থাকেন।

৮. সনি বিল উইলিয়ামস: ৩৩ বছর বয়সী সনি বিল উইলিয়ামস হলেন নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত রাগবি খেলোয়াড় ও পেশাদার হেভিওয়েট মুষ্টিযোদ্ধা। তিনি দুইবার রাগবি বিশ্বকাপও জেতেন। ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কয়েক বছর আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার প্রচেষ্টায় উইলিয়ামসের মা ‘লি উইলিয়ামস’ ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

৯. জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান: জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান সাবেক ফরাসি ফুটবল খেলোয়াড়। তার জন্ম ফ্রান্সের মার্সাইল শহরে। তার পিতা-মাতা আলজেরীয় বংশোদ্ভূত। জিদানের ডাক নাম জিজু। তিনি স্পেনীয় ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ-এর বর্তমান ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিনয়ী চরিত্রটি তাকে ব্যাপক জনসাধারণের কাছে প্রিয় করেছে।

১০. মেসুত ওজিল: মেসুত ওজিল একজন জার্মান ফুটবলার যিনি প্রিমিয়ার লীগ ক্লাব আর্সেনাল এবং জার্মানি জাতীয় ফুটবল দলে খেলে থাকেন। ওজিল ২০০৬ সাল থেকে জার্মানির বয়সভিত্তিক দল এবং ২০০৯ সাল থেকে জার্মানি জাতীয় ফুটবল দলে খেলে আসছেন। ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপের পারফর্মেন্সের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন এবং গোল্ডেন বল অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয়, যা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়কে দেয়া হয়।

ওজিল ২০০৬ সালে তার বরিষ্ঠ (সিনিয়র) ক্যারিয়ার শুরু করেন বুন্দেসলীগায় তার আদি শহরের ক্লাব শার্লকে ০৪ এর হয়ে। ২০০৮ সালে তিনি ওয়ের্ডার ব্রেমেনে চলে আসেন এবং ২০১০ সালে বিশ্বকাপে তার দারুণ পারফর্মেন্সে মুগ্ধ হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ ওই বছরের আগস্ট মাসে তাকে দলে নেয়।২০১৩ সালের সামার ট্রান্সফার উইন্ডোর শেষ দিনে আর্সেনাল তাদের ক্লাব রেকর্ড £৪২.৫ মিলিয়ন ইউরোর মাধ্যমে তাকে দলে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে তিনি জার্মানির সর্বকালের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় হন।

ওজিল তার সহজসুলভ খেলার ধরন ও তাৎক্ষনিক চতুরতা জন্যে পরিচিত। তার শৈলী ও অন্য খেলোয়াড়কে গোলদানে সহায়তা করার ক্ষমতার জন্য রিয়াল মাদ্রিদের প্রাক্তন ম্যানেজার জোসে মরিনহো তাকে জিনেদিন জিদানের সাথে তুলনা করেছেন। ২০১১ সালে ২৫টি গোলে সহায়তা প্রদান করার মাধ্যমে তিনি সকল প্রধান ইউরোপিয়ান লীগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলে সহায়তা করেন। ২০১২ সালে লা লিগায় তিনি ১৭টি গোলে সহায়তা প্রদান করেন। তিনি ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০১২ উয়েফা ইউরোপিয়ান লীগে ৩টি গোলে সহায়তা করেন যা ছিল টুর্নামেন্টগুলোর সর্বোচ্চ।