অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরু’দ্ধে মা’মলা করা যাবে না

জনস্বার্থ সুরক্ষায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরু’দ্ধে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো মা’মলা গ্রহণ করা যাবে না। এ বিষয়ে বিদ্যমান বিধিবিধান যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য নির্দেশনা দিয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমকে হ’ত্যার উদ্দেশ্যে তার সরকারি বাসায় ঢুকে হাম’লা এবং মাদারীপুরে ডিসি, ইউএনও এবং এসি ল্যান্ডের বিরু’দ্ধে ভূমি দখলকারীদের পক্ষে মা’মলা আমলে নেয়ায় নতুন করে এই চিঠির বিষয়টি সামনে এসেছে।

দু’পৃষ্ঠার চিঠিতে এক স্থানে মূল বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, আ’ইনের শাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সৎ সাহস এবং প্রভাবমুক্ত মনন ও বিবেচনাবোধের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রদান ও দৃঢ়ভাবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধানাবলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক/জেলা ম্যাজিস্ট্রেট/কালেক্টর, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও সরকারি কর্মচারীরা সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মা’মলার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেও মা’মলা করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের আ’ইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা প্রতিপালিত হচ্ছে না।

এতে করে আ’ইনের ব্যত্যয় ছাড়াও মাঠ পর্যায়ে শান্তিশৃ’ঙ্খলা রক্ষা ও অপরা’ধ প্রতিরোধ/দম’নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নদী, খাল-বিল, বন, জলাশয়সহ সরকারি সম্পত্তি ও স্বার্থরক্ষা, অবৈ’ধ ক্ষতিসাধন/জবরদখল প্রতি’রোধ ও উচ্ছেদ অভিযানে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।

অথচ যে কোনো সরকারি কাজ বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংক্ষু’ব্ধ ব্যক্তি আই’নে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল দায়ের কিংবা প্রতিকার চেয়ে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন।

কোনো কর্মচারী কর্তৃক আই’নের গুরুতর অপপ্র’য়োগ, এখতিয়ারবিহীন ক্ষমতা অনুশীলন কিংবা কোনো সিদ্ধান্তে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সংক্ষু’ব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদাল’তের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। অধস্তন আদা’লতগুলোর এখতিয়ার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সেটি বারিত থাকবে তা আই’ন দ্বারা সুনির্দিষ্ট রয়েছে।

চিঠিতে এ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আ’ইন তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হল কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮-এর সেকশন ১৯৭-এর সাবসেকশন (১) এর বিধান। যেখানে বলা আছে, বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কর্তব্য/দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো কাজের জন্য পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো অপরা’ধ আমলে গ্রহণ করা যাবে না। একইভাবে কার্যকর রয়েছে জুডিশিয়াল অফিসার্স প্রটেকশন অ্যাক্ট, ১৮৫০-এর সেকশন। এখানেও একই ধরনের নির্দেশনা রয়েছে।

এছাড়া চিঠিতে মোবাইল কো’র্ট আ’ইন, ২০০৯-এর ১৪ ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘এই আই’ন বা তদাধীন বিধির অধীন প্রণীত সরল বিশ্বাসে কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত, কোনো কাজের জন্য কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি মোবাইল কো’র্ট পরিচালনাকারী এক্সি’কিউটিভ ম্যাজিস্ট্রে’ট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রে’ট বা মোবাইল কো’র্ট পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরু’দ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আই’নগত কার্যধারা রুজু করতে পারবে না।’

অপরদিকে কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮-এর সেকশন ৯ এবং অর্ডার সেভেন, রুল ১১(ডি) এ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদা’লতের এখতিয়ার বারিত হওয়া ও আরজি বা মা’মলা খারিজের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। এছাড়া সেফটি ক্লোজ হিসেবে বিভিন্ন আ’ইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরল বিশ্বাসে কৃ’ত কাজের সুরক্ষা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিধান সন্নিবেশিত রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি পরিবীক্ষণ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব তৌহিদ ইলাহী স্বাক্ষরিত চিঠিটি মঙ্গলবার শেষ বিকালে ইস্যু করা হয়। বিশেষ বাহকের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ আ’ইন সচিবের দফতরে পৌঁছানো হয়। এছাড়া এই চিঠির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সব সিনিয়র সচিব/সচিব, বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিকে দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনস্বার্থে নানারকম ঝুঁ’কি নিয়ে মোবাইল কো’র্ট পরিচালনা করে থাকেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকা’ণ্ড বাস্তবায়নের স্বার্থে তাদের প্রতিনিয়ত নানা শ্রেণির প্রতিপক্ষ মোকাবেলা করে কাজ করতে হয়। সেখানে ভূমি দখলকারী ছাড়াও অবৈ’ধভাবে যারা বালু উত্তোলন করে আসছে তাদের বিরু’দ্ধেও শক্ত ব্যবস্থা নিতে পিছপা হন না বেশির ভাগ কর্মকর্তা।

কিন্তু স্থানীয় অনেক প্রভাবশালীর বিরু’দ্ধে শক্ত হাতে আ’ইন প্রয়োগ করতে গিয়ে ইদানীং ডিসি, ইউএনও এবং এসি ল্যান্ডরা নানাভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া মাম’লা না নেয়ার বিধান থাকলেও কোথাও কোথাও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরু’দ্ধে ফৌজদা’রি মা’মলাও রুজু করার ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি মাদারীপুরের ডিসি ড. রহিমা খাতুন, এডিসি জাকির হোসেন বাচ্চু এবং শিবচরের এসি ল্যান্ড রফিকুল ইসলামের বিরু’দ্ধে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদা’লতে মা’মলা আমলে নেয়া হয়। এতে প্রশাসনজুড়ে ক্ষো’ভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে গত সপ্তাহে ইউএনও ওয়াহিদার ওপর ন্য’ক্কারজনক হা’মলা হওয়ার পর সবাই এর একটা গ্রহণযোগ্য বিহিত দেখতে চান। মাঠ প্রশাসনে যথাযথভাবে আ’ইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যাতে আর কোনো কর্মকর্তাকে হেনস্তা কিংবা হা’মলার শিকার হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করার প্রশ্নে কর্মকর্তারা এবার একাট্টা।

সূত্র: যুগান্তর।