মেসির সুরে সুর মেলাচ্ছে বার্সা

“মেসি বনাম বার্সা”। প্রায় ১৫ দিনের বা ১৫ পর্বের ওয়েবসিরিজই চলছিল বলা চলে। গোটা বিশ্ব জুড়ে তোলপাড় চলেছিল এই ডুয়েল দেখতে। কত ক্ষো’ভ -বিক্ষো’ভ। গুজ’বের গরু গাছে চড়লো, আবার নামলো। মিছিল হলো, ক্লাবের সামনে ক্ষুব্ধ সম’র্থকদের ভিড় জমল। সবার গায়ে একটাই জার্সি। এমএল টেন। সবার মুখে একটাই স্লো’গান। ” লিওনেল মেসি, থেকে যাও। বার্তোমেউ, হটে যাও”। বার্সেলোনায় ঝড় বয়ে গেছে মাঝে সেই ক’দিনে।

২৫ আগস্ট ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছে জানিয়ে মেসির “বুরোফ্যাক্স” পাঠানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুরু সেই ঝড়। আর তা শেষ হয়েছে নিজের মনের বিরু’দ্ধে মেসির অন্তত আরেক মরশুম ক্লাবে থাকার ঘোষণায়। যদিও গোলডটকমে সেই ঘোষণা জানানো সাক্ষাৎকারে ক্লাব সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ ও তাঁর অধীন ক্লাবের বোর্ডকে সমালোচনায় বিঁধেছেন মেসি। এরপর কেটে গেছে সপ্তাহখানেক। কিন্তু বার্সা কর্তারা একেবারে নিরুত্তর ছিলেন।

এই এক সপ্তাহে ঝড় কিছুটা কমেছে। উ’ত্তেজনার পারদ নেমেছে। আর অবশেষে বার্সা বোর্ডের কেউ মুখ খুললেন মেসির কথার জবাবে। যদিও ক্লাবের সহসভাপতি পাউ ভিলানোভার বক্তব্য যেন সব সামলানোর। সাজানো-গোছানো বিবৃতিই। ” ও (মেসি) যা বলেছে, সেসব আমাদের ভেবে দেখা উচিত। সমাধান খোঁজা উচিত। ” পাউ ভিলানোভা, বার্সেলোনার সহ-সভাপতি ক্লাবকে অনেক বেশি ভালোবাসলেও বার্সা বোর্ডের ওপর বির’ক্ত মেসি। দলের কাজে লাগবে কি লাগবে না-এটা না বিচার করে একের পর এক তারকার পিছনে ছুটে নিজেদের সুনাম বাড়াতে চাইছে বার্তোমেউর বোর্ড।

বার্তোমেউর শিবিরের কারও পরের মেয়াদে বার্সা সভাপতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়লেও, মাঠে কিন্তু বার্সা হয়ে পড়ছে ভারসাম্যহীন। একের পর এক দ্বিতীয় সারির কোচও এসে ডাগআউটে বসেছে । যার ফল, গত তিন বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সার কাছে -রোমা, লিভারপুল বা বায়ার্ন মিউনিখ হয়ে উঠেছে একটি দুঃস্বপ্ন। অন্তত আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার স্বপ্ন মেসির। অথচ চ্যাম্পিয়নস লিগেই দলকে এভাবে বছরের পর বছর ব্যর্থ হতে দেখছেন। যেখানে দায়টা বার্সা বোর্ডেরই বেশি—তাই এসব মিলিয়েই মেসির বার্সা ছাড়তে চাওয়া।

কিন্তু চাওয়াটা পূরণ হল না । দশ দিনের উত্তেজনার পর অবশেষে মেসি বুঝলেন, আদালতে গিয়ে তাঁর অস্তিত্বে মিশে যাওয়া ক্লাবটার সঙ্গে বিচ্ছেদ না হলে—- বার্সা ছাড়া অসম্ভব। তাই থেকে গেলেন আরেকটা মরশুম। থেকে যাওয়ার ঘোষণায় অনেক কিছু বলে বসেছেন। ক্লাবের যে বড় সফল‍্য পাওয়ার মতো চিত্তাকর্ষক পরিকল্পনা নেই, বার্তোমেউ যে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন…সবই জানিয়ে দিয়েছেন।

মেসির কথার জবাব দিয়ে ইস‍্যুটাকে আরও সকলের কাছে জানাজানি হতে না দেওয়ারই পন্থায় তখন হেঁটেছিল জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউয়ের বার্সেলোনা বোর্ড। দশ দিনে ঝড় কিছুটা থামার পর অবশেষে মুখে বুলি ফুটেছে। বার্সেলোনাভিত্তিক ক্রীড়াদৈনিক স্পোর্ত ক্লাবের সহসভাপতি পাউ ভিলানোভা উদ্ধৃত করে সেই বুলি’র কথা ছাপা হয়েছে। সাজানো গোছানো সেসব কথার শুরুতে মেসির কথা শোনারই প্রতিশ্রুতি আছে।

‘আমরা সত্যিই খুশি যে মেসি আমাদের সঙ্গেই থাকছে। ও যা বলেছে, সেসব আমাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সমাধান খোঁজা উচিত। আমাদের নতুন, আকর্ষণীয় প্রকল্পে সেটাই করছি আমরা।’ অনেকের মতে বার্সেলোনা দলটা বুড়িয়ে গেছে। মেসি-সুয়ারেজ-পিকে-বুসকেটস সমেত দলের আসল নায়ক খেলোয়াড়দের অনেকেরই বয়স ৩০-এর কোটায় চলে গেছে।

এই মরশুমে নতুন কোচ রোনাল্ড কোমানের অধীনে তাই দলে তারুণ্যের ভিড় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বার্সা, যেখানে দলের কেন্দ্রে হবেন মেসিই। এখন পর্যন্ত ৩০-এর বেশি বয়সী মিডফিল্ডার মিরালেম পিয়ানিচ আর তরুণ পর্তুগিজ উইঙ্গার ফ্রান্সিসকো ত্রিনকাও ছাড়া কেউ দলে আসেননি। মূল স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ আর মিডফিল্ডার আর্তুরো ভিদাল দল ছাড়ছেন বলে জোর আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে ক্লাব ছেড়েছেন ইভান রাকিতিচ।

তবে ক্লাবের জেতার খিদে নিয়ে মেসির যে সংশয় তা নিয়ে ভিলানোভার কথা, ‘পেশাদার ক্যারিয়ারে চারপাশের পরিস্থিতি নিয়ে কখনো কখনো এমন সংশয় আমাদের সবারই হয়। সবকিছু ভেবে দেখার পর আমরা হয় সেখানেই থেকে যাই, নতুবা চলে যাই। ওর (মেসি) ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটা হচ্ছে- ও থাকছে। ওর জেতার খিদেও একই থাকবে।’

খিদে যে আছে, তা নিয়ে সংশয় সম্ভবত কারোরই নেই। মেসি এরই মধ্যে দলের অনুশীলনে ফিরেছেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে, আগের মতোই সকলের আগেই অনুশীলনে আসেন ৩৩ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডটি। তবে বার্সার সদলবলে মাঠে নামায় অবশ্য এখনো দেরি আছে। আগস্টে চ্যাম্পিয়নস লিগ আর ইউরোপা লিগে ব্যস্ত থাকা দলগুলোকে বাড়তি ছাড় দিচ্ছে লিগ কর্তৃপক্ষ। যে কারণে স্প্যানিশ লিগ শুরু হয়ে গেলেও বার্সা-রিয়ালের মতো দলগুলো মাঠে নামবে আরও পরে।

আগের মরশুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে বাদ পড়া রিয়াল মাদ্রিদ লিগে খেলতে নামবে ২০ সেপ্টেম্বর। বর্তমান স্প্যানিশ লিগ চ্যাম্পিয়ন জিনেদিন জিদানের দলের শিরোপা ধরে রাখার লড়াই শুরু হবে রিয়াল সোসিয়েদাদের মাঠ থেকে। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ৮-২ গোলের ল’জ্জায় বিদায় নেওয়া বার্সেলোনা মাঠে নামবে ২৬ বা ২৭ সেপ্টেম্বর (এখনো ম্যাচের সময় নির্ধারিত হয়নি)।

মেসিদের প্রথম ম্যাচ নিজেদের মাঠে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে। আতলেতিকো মাদ্রিদও মাঠে নামবে বার্সার মতো একই দিনে। ইউরোপা লিগজয়ী সেভিয়ারও প্রথম ম্যাচ সেই সপ্তাহেই (২৬/২৭ সেপ্টেম্বর)।