এবার কেনা পেঁয়াজ আসতে পারছে না সীমান্ত পেরিয়ে

দেশের বাজারে সংক’টের অজুহাতে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ১০০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। অথচ দেশের কেনা পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে সীমানার ওপারে। পেঁয়াজবোঝাই করে শুধু হিলি বন্দরের কাছেই সীমান্ত পার হতে অপেক্ষায় রয়েছে দেড়শতাধিক ট্রাক। সোমবারে আটকে পড়া এসব ট্রাক গতকালও ছাড় করতে দিনভর হিলিতে অপেক্ষা করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, ট্রাকে থেকে এসব পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এসব ট্রাক ছেড়ে দিতে এরই মধ্যে ভারতের সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যদেশ থেকে আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেগুলো শিগগিরই দেশে এসে পৌঁছবে। তখন পেঁয়াজের সরবরাহ সমস্যা থাকবে না। দামও নেমে যাবে। এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে বাজারে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দাম কমিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া টিসিবির বিক্রিও বাজার স্বাভাবিক করতে সহায়তা করবে।

এদিকে পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়েছে এনবিআর। আর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এলসি খোলার সুদ হার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

দিনাজপুরের হিলির পরিস্থিতি

বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় গত সোমবার থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। সীমান্তের ওপারে দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড় শতাধিক পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক। গত ৪ দিন আটকে থাকা পেঁয়াজ এরই মধ্যে নষ্ট হতে চলেছে বলে আশঙ্কা করছেন হিলি বন্দরের আমদানিকারকরা। পেঁয়াজ আমদানি হবে—এমন আশ্বাসে সকাল থেকে বন্দরের জিরোপয়েন্টে গিয়ে অপেক্ষা আর খোঁজখবর নেন ব্যবসায়ীরা । এই এক ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা পর পেঁয়াজের ট্রাক প্রবেশ করবে—এমন সংবাদে হিলি বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে।

ভারত সরকার বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে অটুট থাকলেও গত রবিবারে টেন্ডার করা পেঁয়াজ ঢুকতে দেবে—এমনই কথা শোনা যাচ্ছে। বুধবার সকাল থেকে আমদানি না হওয়ায় বৃহস্পতিবার আমদানি হবে এমনই অপেক্ষায় থাকেন পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। কিন্তু ওপারের রপ্তানিকারকরা জানান, কাস্টমসকে অনুমতিপত্র না দেওয়ার কারণে তাঁরা বৃহস্পতিবারও পেঁয়াজ ছাড় করতে পারেনি। তবে শনিবার সরবরাহ করা যাবে—এমনই আশ্বাস দিচ্ছে ওপারের রফতানিকারকরা। হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশিদ হারুন জানান, গত রবিবার পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার টন পেঁয়াজের এলসি করা হয়েছে।

দেশে পেঁয়াজ প্রবেশ করছে—এমন খবরে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম কমতে শুরু করছে। মঙ্গলবার যে পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, ওই পেঁয়াজই বৃহস্পতিবার বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যা বলছে

চাহিদা মোতাবেক বাজারে পেঁয়াজের মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের বাজারে দাম কমে আসছে বলেও দাবি করা হয়।মন্ত্রণালয় বলছে, পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনীতিক মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য দেশটির পররাষ্ট্রসচিবকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে সেই চিঠির ভিত্তিতে ভারত কিছু জানিয়েছে কি না তা বলা হয়নি।

আমদানীকৃত পেঁয়াজ স্থলবন্দর থেকে দ্রুততম সময়ে ছাড় করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এনবিআরের চেয়ারম্যান এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত পেঁয়াজের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এনবিআর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। কৃষি মন্ত্রণালয়ে পেঁয়াজের বিষয়ে দ্রুত সঙ্গনিরোধ সনদ ইস্যু শুরু করেছে বলেও মন্ত্রণালয় জানায়।

মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং জোরদার করেছে। দেশের পেঁয়াজ উত্পাদনকারী জেলাসহ (ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ী, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর) সব জেলার প্রশাসকদের সরবরাহ ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না থাকে, সে বিষয়ে মনিটরিং জোরদার করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া পরিস্থিতি পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তিনজন যুগ্ম সচিবকে উল্লিখিত জেলায় পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি বন্দরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রিপরিষদসচিব বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকদের কাছে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

অভিযান

কেজিপ্রতি পেঁয়াজের মূল্য তালিকায় লেখা আছে ৮৫ টাকা। কিন্তু বিক্রি করছে ৯২ থেকে ৯৫ টাকা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী এলাকায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে এমন চিত্র উঠে আসে। এই অপরাধে চারটি পেঁয়াজের আড়তকে জরিমানা করা হয়েছে। অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল জানান, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে অভিযানে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানকে মূল্য তালিকা থেকে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা যায়।

সূত্র: কালের কণ্ঠ অনলাইন।