তিস্তাপাড়ে গড়ে উঠবে শহর, পর্যটনকেন্দ্র

তিস্তা নদী ঘিরে মহাপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। এ লক্ষ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন’ নামে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর দুই পাড়ে ২২০ কিলোমিটার গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। গড়ে উঠবে আধুনিক শহর ও পর্যটনকেন্দ্র। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকৌশলগত ও আর্থিক সহায়তা দেবে ইয়োলো রিভার ইঞ্জিনিয়ারিং চায়না নামে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। চীনও সহজ শর্তে এবং স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে আগ্রহী।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা রেস্টোরেশন প্রকল্পে পাড় বাঁধানো ও সংস্কার, নদীর বিস্তৃতি একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপে আনা এবং ভূমি পুনরু’দ্ধার বেশি গুরুত্ব পাবে। এর ফলে তিস্তার পাড়ে থাকা শত শত একর ভূমি পুনরু’দ্ধার হবে, যা ভূমিহীন মানুষের আশ্রয়স্থল কিংবা শিল্পায়নের কাজে লাগানো হবে। চীনা প্রতিষ্ঠান চীনের হোয়াং হো নদী ও সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়কে আধুনিকভাবে গড়ে তুলবে। বাঁধের দুই পাশে থাকবে সমুদ্রসৈকতের মতো মেরিন ড্রাইভ। দুই পাশের রাস্তা দিয়ে পণ্য পরিবহন করা যাবে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট গড়ে তুলতে আগ্রহী হবেন। এখানে দেড়শ’ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হবে। আধুনিক সেচ প্রকল্প ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ কৃষি খামার তৈরি হবে। তিস্তা হবে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে গোটা উত্তরাঞ্চলের চিত্র পাল্টে যাবে। কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। শিগগিরই দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম সমকালকে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেই ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে। তবুও তিস্তাকে ঘিরে বাংলাদেশ বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে দাতা দেশগুলোর সামনে তিস্তা ঘিরে এ প্রকল্প সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পটির বিষয়ে চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। সমীক্ষা শেষে প্রকল্পটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) রয়েছে। চীন ইআরডির সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন’ প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী আজিজ মুহাম্মদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, তিস্তা নদী খনন, নদীর দুই পাড়ে তীররক্ষা কাজ, চর খনন, দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, ১৪ হাজার কোটি টাকার জমি পুনরুদ্ধার এবং এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা হবে। প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন এবং হাজার হাজার বাড়িঘর রক্ষা পাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভারত থেকে অতিরিক্ত পানি পাওয়ার চুক্তির প্রয়োজন হবে না। পৃথক প্রজেক্ট আকারে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ বাস্তবায়ন করবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বেইজিং সফরের সময় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয়ে চীনের সহায়তা চেয়েছিলেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট। এক সময় চীনের অভিশাপখ্যাত হোয়াং হো নদী নিয়ন্ত্রণ করে চীনের আশীর্বাদে পরিণত করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের তিস্তাকে আশীর্বাদে রূপ দেওয়া যায় কিনা তার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সফরে চীন আশ্বাস দেয়, তারা জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ক কেন্দ্র এবং তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়ন করবে।

চীন সরকার নিজ উদ্যোগে তিস্তা নদীর ওপর সমীক্ষা চালায়। চায়না পাওয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই জরিপ ও নকশা করে। সমীক্ষা শেষে একটি প্রকল্প নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। ইতোমধ্যে চায়না পাওয়ার কোম্পানি তিস্তাপাড়ে নির্মিতব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। তিস্তাপাড়ের জেলা নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধায় চীনের তিনটি প্রতিনিধি দল কাজ করছে। সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য প্রাথমিক ব্যয় ধরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রস্তাব ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সারা বছর নৌ চলাচলের মতো তিস্তায় পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এই সংরক্ষিত পানি দিয়ে নদীপাড়ের পুনরুদ্ধার হওয়া লাখ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ ব্যবস্থা করা যাবে। গড়ে উঠবে আধুনিক কৃষি খামার। পুনর্বাসন করা হবে তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ ভূমিহীন, নদীভাঙা পরিবারকে। তিস্তা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় সম্পদ। ফিরে আসবে জীববৈচিত্র্য। মরু প্রক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে তিস্তাপাড়ের পাঁচ জেলার লাখ লাখ মানুষ। কর্মসংস্থান হবে ৬ থেকে ৮ লাখ বেকার তরুণের।

ভারত থেকে বাংলাদেশে যে ৫৪টি নদী প্রবেশ করেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে তিস্তা। এটি ভারতের সোলামো লেক থেকে উৎপত্তি হওয়ার পর সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এটি কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশে তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার। তিস্তার কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষ এর পাড়ঘেঁষে বসতি গড়ে তুলেছে। তিস্তা মিঠাপানির একটি বড় উৎস। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, তিস্তা রেস্টোরেশন প্রকল্পে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাড় বাঁধানো ও সংস্কার, নদীর বিস্তৃতি একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপে আনা এবং ভূমি পুনরু’দ্ধার।

সংশ্নিষ্টরা জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে লালমনিরহাট জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে কাকিনার মহিপুরে তিস্তা নদীতে সেচ প্রকল্প (তিস্তা ব্যারাজ) নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর কাকিনায় সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে খরস্রোতা তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের আশীর্বাদ থেকে অভিশাপে পরিণত হয়। ১৯৮৯ সালের পর থেকে তিস্তা নদী ঘিরে পেশাজীবী যেমন মৎস্যজীবী, খেয়াঘাটের মাঝি, কৃষিজীবীসহ নানা পেশার হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে।

লাখ লাখ হেক্টর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ১২ বছরের ঐকান্তিক চেষ্টায় তিস্তাপাড়ের মানুষকে নানা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসেন। বাড়িতে বাড়িতে খামার করতে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। গবাদিপশু পালনসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চরের নারীদের সম্পৃক্ত করতে শুস্ক মৌসুমে বিভিন্ন ফসল ফলাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিনামূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কিষান-কিষানিকে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ শুরু করে সরকার।

প্রায় প্রতিটি চরে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৬ হাজার জনবসতি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। কর্মহীন মানুষের কাজ নিশ্চিত করতে বছরে দুইবার ৪০ দিন করে কর্মসৃজন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।

সূত্র: সমকাল।