পচা পেঁয়াজে গচ্চা ১০ কোটি টাকা

ভারতের পেঁয়াজ রফতানির সিদ্ধান্তে হঠাৎই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বিকল্প তৈরি করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে এসেছে পেঁয়াজের বড় চালান। দেশি পেঁয়াজের মতো দেখতে মিয়ানমারের এই পেঁয়াজেই সমাধান খুঁজছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি বিকল্প আরো ৬টি দেশ থেকে আসছে পেঁয়াজ। এরই মধ্যে পৌনে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চলতি মাসে প্রথম ২০ দিনে এসব পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নেন তারা।

এত কম সময়ে বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি সংগ্রহে এটি রেকর্ড বলে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আগামী মাসের শুরু থেকে এসব পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ঢুকবে আরো কয়েকশ টন মিয়ানমারের পেঁয়াজ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, এ মাসের ২০ দিনে মোট ৫ লাখ ৭২ হাজার ৯৭৫ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছে পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর একদিনে সর্বোচ্চ বা এক লাখ ৫৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন দুই শতাধিক ব্যবসায়ী। মোট ৮৩৫টি চালানে এসব পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আনার কথা রয়েছে। এ সপ্তাহেই আমদানি অনুমতির পরিমাণ ছয় লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ঢাকার অধিদফতরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দের পরিচালক কৃষিবিদ আজহার আলী বলেন, ‘যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে তা রেকর্ড। এই পেঁয়াজ আমদানি হলে বাজার সয়লাব হয়ে যাবে। কোনো সংকট থাকবে না।’

মিয়ানমার ছাড়াও পাকিস্তান, চীন, মিসর, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। ঋণপত্র খোলার পর এসব পেঁয়াজ কনটেইনারবাহী জাহাজে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনটেইনারে করে সমুদ্রপথে আনা হবে চট্টগ্রাম বন্দরে। বিকল্প দেশের বন্দরে জাহাজে বোঝাই করার পর পেঁয়াজ আমদানিতে দেশভেদে ন্যূনতম ১৫ থেকে এক মাস সময় লাগতে পারে বলে জাহাজ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত বছর ভারত রফতানি বন্ধের প্রায় এক মাস পর আমদানির অনুমতি নেয়ার হিড়িক পড়ে। তবে এবার রফতানি বন্ধের আগে থেকেই বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিতে শুরু করেন তারা। এখন দিন দিন রেকর্ড হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, রফতানি বন্ধের আগে ভারত থেকে এ মাসের প্রথম ১৪ দিনে প্রায় ৪৫ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। স্থলবন্দরে আটকে থাকা আরো প্রায় ১৫ হাজার টন পেঁয়াজ এখন খালাস হচ্ছে। এ হিসেবে এ মাসে পেঁয়াজের আর সংকট হবে না।

আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানির উদ্যোগ নেয়া হলে, মিয়ানমারের পেঁয়াজ দিয়েই আপাতত চাহিদা মেটানো সম্ভব। কমে যাবে পেঁয়াজের দামও। গত রবিবার রাতে, খাতুনগঞ্জের মেসার্স মাবুদ খান অ্যান্ড সন্স আড়তে আসে প্রায় ২৮ টনের মতো মিয়ানমারের পেঁয়াজ। দেখতে অনেকটা দেশি পেঁয়াজের মতো হওয়ায়, একদিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায় সব।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি করতে সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন। কিন্তু লকডাউনের কারণে মিয়ানমার এই বন্দরটি বন্ধ রাখায় বিকল্প পথ সিঙ্গাপুর বন্দর হয়ে পেঁয়াজ আনতে হচ্ছে এখন। এতে সময় লাগছে ২০ থেকে ২৫ দিন, বাড়ছে খরচও। পরিমাণে বেশি আনা যাচ্ছে না। তারা বলেছেন, টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা গেলে খুব দ্রুতই বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন বা উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দে র তথ্যমতে, মিয়ানমারের পাশাপাশি বিকল্প ৬টি দেশ থেকে এর মধ্যেই প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। চাক্তাই খাতুনগঞ্জের প্রায় দেড় শতাধিক আড়তে বর্তমানে মজুদ রয়েছে প্রায় ৮ হাজার টন পেঁয়াজ। সঠিক সময়ে পেঁয়াজ চলে আসলে বাজারে সংকট থাকবে না। ভারতীয় পেঁয়াজ ছাড়াই স্থিতিশীল থাকবে বাজার।

লোকসান ১০ কোটি টাকা : আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, নিষেধাজ্ঞার পাঁচদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর শর্ত সাপেক্ষে আগের এলসি করা পেঁয়াজের ট্রাকগুলো বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয় ভারত। তবে টানা ৭-৮ দিন ট্রাকে আটকে থাকায় এসব পেঁয়াজের অধিকাংশ পচে যায়। গতকাল পর্যন্ত দেশে আমদানিকৃত ৯২৫ মেট্রিক টন ভারতীয় পেঁয়াজে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে দুই কোটি টাকার অধিক।

সবমিলে ১৬৫ ট্রাক পেঁয়াজে আমদানিকারকদের ক্ষতি প্রায় ১০ কোটি টাকা। ভোমরা স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতীয় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পর ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে আসে আগের এলসি করা ৩১ ট্রাকে ৭২১ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর পাঁচ ট্রাকে ১০৮ মেট্রিক টন, ২১ সেপ্টেম্বর চার ট্রাকে ৯৬ মেট্রিক টন ভারতীয় পেঁয়াজ দেশে আসে। আমদানি করা এসব পেঁয়াজের অধিকাংশই পচা।

ভোমরা স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম এই প্রদিবেদকে বলেন, টানা ৭-৮ দিন ভারতে আটকা পড়ে থাকায় প্রতিটি ট্রাকের ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি পেঁয়াজগুলো কিছুটা ভালো। তবে সেগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম অর্থাৎ জেলার বাইরে পাঠানোর অবস্থা নেই। স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে এসব পেঁয়াজ। ভারতীয় এসব পচা পেঁয়াজ কম দামেও বিক্রি হচ্ছে না। এসব পেঁয়াজ নিয়ে চরম বিপদে পড়েছি আমরা।

তিনি বলেন, প্রতি ট্রাক পেঁয়াজের মূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। প্রতিটি ট্রাকে ব্যবসায়ীদের পাঁচ-ছয় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। ওপারে যে ট্রাকগুলো এখনো আটকা রয়েছে সেগুলোর পেঁয়াজ একটাও ভালো থাকবে না। সবমিলে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। তবে এখনো পেঁয়াজ রফতানির ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি ভারত। যে পেঁয়াজগুলো এখন আসছে সেগুলো আগের এলসি করা।

সাতক্ষীরার বড় বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সাকিব এন্টারপ্রাইজের মালিক কামরুজ্জামান মুকুল বলেন, বর্তমানে ভারত থেকে যে পেঁয়াজ আসছে তার সবই পচা। এসব পেঁয়াজের ক্রেতা নেই। কম দামে বিক্রি করছি এসব পেঁয়াজ।

ভোমরা স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মহসিন হোসেন বলেন, আগের এলসি করা ৪০ ট্রাকে ৯২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ এ পর্যন্ত দেশে এসেছে। গতকাল কোনো ট্রাক আসেনি। তবে এখনো কয়েকটি পেঁয়াজের ট্রাক আটকে আছে ভারতে। হঠাৎ করে কেন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করল সে বিষয়ে আমাদের এখনো কিছু জানায়নি ভারত।

দেশি পেঁয়াজই ভরসা: আমাদের ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বাজারে নজরদারি ও দেশি পেঁয়াজের ওপর নির্ভর করাকেই সমাধান ভাবছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাফর উদ্দীন। গতকাল ফরিদপুরের স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেদেশের সরকার আকস্মিকভাবে কাঁটা টুকরা ও গুঁড়া ছাড়া সব ধরনের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার দুই দিন পর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পেঁয়াজ আমদানির ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।