কোরআন এবং হাদিসের আলোকে ধ’র্ষণের শা’স্তি

ইসলাম ধ’র্ষণকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞা’য়িত করেনি। কারণ বিবাহ বহির্ভূত যেকোন যৌ’ন সঙ্গ’মই ইসলামে অপ’রাধ। তাই ধ’র্ষণও ব্যভি’চার। ইসলামী আ’ইন শা’স্ত্রে ধর্ষ’কের শা’স্তি ব্যভি’চারকারীর শা’স্তির অনুরূপ। তবে অনেক ইসলামী স্কলার ধর্ষ’ণের ক্ষেত্রে অতিরি’ক্ত কিছু শা’স্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ব্য’ভিচার সুস্পষ্ট হা’রাম এবং শি’রক ও হ’ত্যার পর বৃহত্তম অপ’রাধ। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর ব্যভি’চারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অ’শ্লী’ল কাজ এবং ম’ন্দ পথ। সূরা আল ইসরা: ৩২

ইমাম কুরতুবি(রহঃ) বলেন, ‘উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘ব্য’ভিচার করো না’-এর চেয়ে ‘ব্য’ভিচারের কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশী কঠো’র বাক্য।’ এর অর্থ যেসব বিষয় ব্যভি’চারে ভূমিকা রাখে সেগুলোও হা’রাম। হাদিস দ্বারা ধ’র্ষণের শা’স্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। যেমন-

(১) হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রাঃ) বর্ণনা করেন, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে এক মহিলাকে জোরপূ’র্বক ধ’র্ষণ করা হলে হযরত রাসূলুল্লাহ(সাঃ) তাকে কোন শা’স্তি দেননি। তবে ধ’র্ষককে হদের (কোরআন-হাদিসে বহু অপরা’ধের ওপর শা’স্তির কথা আছে। এগুলোর মধ্যে যেসব শা’স্তির পরিমাণ ও পদ্ধতি কোরআন- হাদিসে সুনির্ধারিত তাকে হদ বলে) শা’স্তি দেন।’ -ইবনে মাজাহ: ২৫৯৮

(২) সরকারী মালিকানাধীন এক গোলাম গণিমতের পঞ্চমাংশে পাওয়া এক দাসীর সঙ্গে জবরদ’স্তি করে ব্যভি’চার (ধ’র্ষণ) করে। এতে তার কুমারী’ত্ব ন’ষ্ট হয়ে যায়। হযরত ওমর(রাঃ) ওই গোলামকে কষাঘা’ত করেন এবং নির্বা’সন দেন। কিন্তু দাসিটিকে সে বাধ্য করেছিল বলে তাকে কষাঘা’ত করেননি।’ সহিহ বোখারি: ৬৯৪৯

ব্য’ভিচারের শা’স্তি: ইসলামে ব্যভি’চারের শা’স্তি ব্যক্তি ভেদে একটু ভিন্ন। ব্যভি’চারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদ’ন্ড দেওয়া হবে। আর যদি অবি’বাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশ’ ছ’ড়ি মা’রা হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই শা’স্তি। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভি’চারিনী নারী ব্যভি’চারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রা’ঘাত করো। আল্লাহ্র বিধান কার্যকর করতে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রে’ক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ্র প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শা’স্তি প্রত্যক্ষ করে।’ সূরা নূর: ২

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবি’বাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে শা’স্তি একশ’ বেত্রা’ঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বি’বাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে একশ’ বেত্রা’ঘাত ও রজম(পাথর মে’রে মৃ’ত্যুদ’ন্ড)।’ সহিহ মুসলিম এই হাদিসের আলোকে অন্য মাজহাবের ইসলামী স্কলাররা বলেছেন, ব্য’ভিচারী অ’বিবাহিত হলে তার শা’স্তি দু’টি। (১) একশ’ বেত্রা’ঘাত (২) এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর হানাফি মাজহাবের বিশেষজ্ঞরা বলেন, এক্ষেত্রে হদ(শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত শা’স্তি) হলো একশ’ বেত্রা’ঘা’ত। আর দেশান্তরের বিষয়টি বিচা’রকের বিবেচ’নাধীন। তিনি ব্যক্তি বিশেষে তা প্রয়োগ করতে পারেন।

ধ’র্ষণের শা’স্তি: ধর্ষ’ণের ক্ষেত্রে একপক্ষে ব্যভি’চার সংগঠিত হয়। আর অন্যপক্ষ হয় নির্যা’তিত। তাই নির্যা’তিতের কোন শা’স্তি নেই। কেবল অত্যা’চারী ধর্ষ’কের শা’স্তি হবে। ধ’র্ষণের ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় সংঘ’ঠিত হয়। (১) ব্য’ভিচার (২) বলপ্রয়োগ বা ভী’তি প্রদর্শন। প্রথমটির জন্য পূর্বোক্ত ব্যভি’চারের শা’স্তি পাবে। পরেরটির জন্য ইসলামী আই’নজ্ঞদের একাংশ বলেন, মুহারাবার শা’স্তি হবে। মুহারাবা হলো পথে কিংবা অন্যত্র অ’স্ত্র দেখিয়ে বা অ’স্ত্র ছাড়া ভী’তি প্রদর্শন করে ডাকা’তি করা। এতে কেবল সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হতে পারে, আবার কেবল হ’ত্যা করা হতে পারে।

আবার দু’টিই হতে পারে। মালেকি মাজহাবের আইনজ্ঞরা মুহারাবার সংজ্ঞায় সম্ভ্র’ম লু’ট করার বিষয়টি যোগ করেছেন। তবে সব ইসলামী স্কলারই মুহারাবাকে পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, নিরাপ’ত্তা বিঘি’ত্ন তকরণ ও ত্রাস সৃষ্টি ইত্যাদি অর্থে উল্লেখ করেছেন। মুহারাবার শা’স্তি আল্লাহ্তায়ালা এভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘যারা আল্লাহ্ ও তার রাসূলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গা’মা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয় তাদের শা’স্তি হচ্ছে-তাদেরকে হ’ত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পাগুলো কে’টে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কা’র করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্চ’না আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শা’স্তি।’ সূরা মায়িদা: ৩৩।

এখানে হত্যা করলে হ’ত্যার শা’স্তি, সম্পদ ছিনিয়ে নিলে হাত-পা কেটে দেয়া, সম্পদ ছিনিয়ে হ’ত্যা করলে শূলে চড়িয়ে হ’ত্যা করার ব্যাখ্যা আ’ইনজ্ঞরা দিয়েছেন। আবার এর চেয়ে লঘু অপ’রাধ হলে দেশান্তরের শা’স্তি দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মোট কথা হাঙ্গা’মা ও ত্রাস সৃষ্টি করে করা অপরা’ধের শা’স্তি ত্রাস ও হাঙ্গামাহীন অপরা’ধের শা’স্তি থেকে গুরুতর। বাংলাদেশের আ’ইনে ধ’র্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্র’তারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করে অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহি’ত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌ’ন স’ঙ্গম করেন তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধ’র্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’

ইসলামের সঙ্গে এই সংজ্ঞার তেমন কোন বিরো’ধ নেই। তবে এতে কিছু অসা’মঞ্জস্যতা রয়েছে। ইসলাম সম্মতি-অসম্ম’তি উভয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিল’নকে দ’ন্ডনীয় অপ’রাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই আ’ইনে কেবল অসম্ম’তির ক্ষেত্রে তাকে অপ’রাধ বলা হয়েছে। সম্মতি ছাড়া বিবাহ বহি’র্ভূত সম্পর্ক ইসলাম ও দেশীয় আ’ইন উভয়ের চোখে অপরা’ধ। বাংলাদেশের আ’ইনে ধর্ষ’ণের কারণে মৃ’ত্যু না হলে তার মৃ’ত্যুদ’ন্ড নেই। কেবল যাব’জ্জীবন কারাদ’ন্ড এবং অর্থদ’ন্ড। পক্ষান্তরে ইসলামে বিবা’হিত কেউ ধ’র্ষণ বা ব্য’ভিচার করলে তার শা’স্তি পাথর মে’রে মৃ’ত্যুদ’ন্ডের কথা বলেছে। আই’নে ধ’র্ষণের কারণে মৃ’ত্যু হলে তাকে মৃ’ত্যুদ’ন্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ইসলামে ধ’র্ষণের কারণে মৃ’ত্যু হলে সে প্রথমে ব্যভিচারের শা’স্তি পাবে।

পরে হ’ত্যার শা’স্তি পাবে। হত্যা যদি অ’স্ত্র দিয়ে হয় তাহলে কেসাস বা মৃ’ত্যুদ’ন্ড। আর যদি অ’স্ত্র দিয়ে না হয়ে এমন কিছু দিয়ে হয় যা দিয়ে সাধারণত হ’ত্যা করা যায় না তাহলে অর্থদ’ন্ড। যার পরিমাণ একশ’ উটের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ (প্রায় কোটি টাকা)। ধ’র্ষণের সঙ্গে যদি আরও কিছু সংশ্লি’ষ্ট হয়, যেমন- ভি’ডিওধারণ, ওই ভি’ডিও প্রচার ইত্যাদি; তাহলে আরও শা’স্তি যুক্ত হবে।

ইসলামে ধ’র্ষণ প্রমাণের নীতিমালা: ব্যভি’চার প্রমাণের জন্য ইসলামে দু’টির যে কোনটি জরুরী। (ক) ৪জন সাক্ষী (খ) ধ’র্ষকের স্বীকারোক্তি। তবে সাক্ষী না পাওয়া গেলে আধুনিক ডি’এনএ টে’স্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভি’ডিও, ধ’র্ষিতার বক্তব্য ইত্যাদি অনুযায়ী ধর্ষ’ককে দ্রুত গ্রে’ফতার করে স্বীকার করার জন্য চাপ দেয়া হবে। স্বীকারোক্তি পেলে তার ওপর শা’স্তি কার্যকর করা হবে। ইসলামে ধ’র্ষণ ও ব্য’ভিচার, সম্মতি-অসম্ম’তি উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষের শা’স্তি নির্ধারিত রয়েছে। তবে নারীর ক্ষেত্রে ধ’র্ষিতা হলে কোন শা’স্তি নেই, সম্মতিতে হলে শা’স্তি আছে। যৌ’ন অপরা’ধ নির্ণয়ে ইসলাম নির্ধারিত বিভাজন রেখা(বিবাহিত-অবিবাহিত) সর্বোৎকৃ’ষ্ট।

বাংলাদেশের প্রচলিত আ’ইনে যতটুকু শা’স্তি রয়েছে তা প্রয়োগে নানাবিধ বিলম্ব আর বিভিন্ন রাজনৈ’তিক-অরাজনৈ’তিক চাপের কারণে ধ’র্ষণের উপযুক্ত শা’স্তি হয় না। উপরন্তু ধ’র্ষিতাকে একঘরে করে রাখা হয়, তাকে সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়। তার পরিবারকে হুম’কি-ধম’কি দেয়া হয়। ইসলাম এসব সমর্থন করে না। তবে এসব শা’স্তি কেবল রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অনুমোদনপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োগ করবে, ব্যক্তি পর্যায়ের কেউ নয়। মহান আল্লাহ্তায়ালা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে হেফাজত করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, সাবেক ইমাম ও খতিব কদমতলী মাজার জামে মসজিদ, সিলেট।