ফাঁ’সির দ’ণ্ড পাওয়া সেই ঐশী এখন কেমন আছেন?

মনে আছে- রাজধানীর চামেলীবাগে নিজ বাসায় বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমানকে নিজ হাতে হ’ত্যাকরা ঐশী রহমানের কথা? হয়ত অনেকেই ভুলে গে’ছেন! সেই ২০১৩ সালের কথা। ওই বছর ১৬ আগস্ট সকালে ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানের ঘরে নেমে আসে অন্ধকার। তারপরের ঘটনা সবারই জানা। এরপর দেশে ঘটে যাওয়া অসং’খ্য ঘটনার চাপে চাপা পড়ে গেছে ঐশীর গল্প। কিন্তু কেমন আছেন সেই ঐশী?

একটা সময় ছিল যখন রাজধানীর বুকে নামিদামি রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেয়া, বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটানো ছিল ঐশীর নিত্য দিনের রুটিন। কিন্তু অসৎ সঙ্গ তাকে পৃথিবীর সব চেয়ে নোং’রা কাজটি করতে প্রে’রণা জু’গিয়েছে। বাবা-মা পরিবারের অন্যদের নিয়ে যার এখন মেতে থাকার কথা ছিল, সেই ঐশী এখন কারাগা’রে বন্দী। যেখানে একাকী সময় কাটছে তার? কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, অনেক ভদ্র, শান্ত ও ধা’র্মীক হয়ে উঠেছেন একসময়ের উশৃ’ঙ্খল ঐশী। নামাজও পড়েছেন নিয়মিত।

ঐশী যখন তার বাবা-মাকে হ’ত্যা করে, তখন সে নেশাসক্ত ছিল। নির্বিবাদে নেশা করার জন্যই কফির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে এবং পরে কু’পিয়ে হ’ত্যা করে বাবা-মাকে। সেই নেশা এখন আর নেই ঐশীর মধ্যে। স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে সে। তবে এখন সে অনেক চু’পচাপ থাকে। বিশেষ করে ফাঁ’সির আদেশ হওয়ার পর থেকে ঐশী আর আগের মতো আ’চরণ করে না। যদিও পরবর্তিতে তার সাজা কমে যাব’জ্জীবন কারাদ’ণ্ড হয়।

প্রসঙ্গত, দ’ণ্ড কমানোর ব্যাখ্যায় আদা’লত বলেন, পাঁচটি কারণে ঐশীর মৃ’ত্যুদ’ণ্ড কমিয়ে যা’বজ্জীবন করা হয়েছে।

১ . হ’ত্যাকা’ণ্ডের সময় ঐশী মাদকাসক্ত ছিলেন এবং ১৪ বছর বয়স থেকেই তিনি সিসা, ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলের মতো নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতেন।

২ . ঐশী বংশগতভাবে মান’সিক রোগী। তার চাচা-দাদি-খালা অনেকের মধ্যেই মানসিক রোগের লক্ষণ আছে, যা তার মধ্যেও ছোটবেলা থেকে বিদ্যমান।

৩ . হ’ত্যাকা’ণ্ডের ঘটনার দ্বিতীয় দিনের মাথায় ঐশী আত্মসমর্পণ করেছেন। এতে বোঝা যায়, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

৪ . ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৯ বছর। এ বয়সের একটি সন্তানকে তার বাবা-মা যথাযথভাবে দেখভাল করেননি। ফলে ঐশী ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।

৫ . ঐশীর বাবা-মা দুজনেই সন্তানের লালনপালন বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। এ কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি স্নেহবঞ্চিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

এর আগে ঐশী রহমানকে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর দুবার মৃ’ত্যুদ’ণ্ডাদেশ দেন আদালত। প্রত্যেক মৃ’ত্যুদ’ণ্ডের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, অনাদায়ে দুই বছর কারাদ’ণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। সেই থেকে ঐশী স্থায়ীভাবে কাশিমপুর মহিলা কা’রাগারের বাসিন্দা।

কারা সূত্রে জানা যায়, নেশাস’ক্তি কেটে যাওয়ার পর থেকেই অনুশোচনা চলছে ঐশীর ভেতর। এখন প্রায়ই অনুশোচনায় নিস্ত’ব্ধ হয়ে থাকে সে। মাঝে মাঝে একা একা ফুপিয়ে কাঁদে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট সকালে চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগেই তাদের মেয়ে ঐশী বাসা থেকে পালিয়ে যায়।

পরদিন ১৭ আগস্ট মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান এ ঘটনায় পল্টন থা’নায় হ’ত্যা মা’মলা করেন। ওই দিনই ঐশী পল্টন থা’নায় আ’ত্মসমর্পণ করে তার বাবা-মাকে খু’ন করার কথা জানায়। পরে ২৪ আগস্ট আ’দালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয় ঐশী। তবে পরে ওই জবানবন্দি প্র’ত্যাহারের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু সাক্ষ্য, আ’লামত ও অন্যান্য যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে তা না’কচ হয়ে যায়।

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর আলোচিত এ মা’মলার রায়ে ঐশীকে মৃ’ত্যুদ’ণ্ড দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩। পাশাপাশি হ’ত্যাকা’ণ্ডে সহায়তার দায়ে তার বন্ধু মিজানুর রহমানকে দুই বছরের কারাদ’ণ্ড দেওয়া হয়। তবে আরেক বন্ধু আসাদুজ্জামান জনিকে খা’লাস দেওয়া হয়।

নিম্ন আদা’লত রায়ের পর্যবেক্ষণে জানায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, ঘটনার সময় আসা’মি ঐশী প্রাপ্তবয়’স্ক ছিলেন। আর হ’ত্যাকা’ণ্ডটিও ছিল পরিকল্পিত ও নৃ’শংস। তবে ঐশী রহমানের অপ’রাধ মৃ’ত্যুদ’ণ্ডের যোগ্য হলেও তার বয়স ও মা’নসিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে মৃ’ত্যুদ’ণ্ডের সাজা কমিয়ে যাব’জ্জীবন কারাদ’ণ্ডের রায় দেন উচ্চ আদা’লত।

পর্যবেক্ষণে ওই সময় আদালত বলেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃ’ত্যুদ’ণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোনো গাইডলাইন নেই। পরিবেশও এখনো আসেনি। শিক্ষার হার যেমন বেড়েছে তেমনি জনসংখ্যাও বেড়েছে। এ কারণে অপ’রাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃ’ত্যুদ’ণ্ড রহিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

তবে মৃ’ত্যুদ’ণ্ডই একমাত্র দৃষ্টা’ন্তমূলক শা’স্তি নয় জানিয়ে আদালত রায়ে বলেছে, মৃ’ত্যুদ’ণ্ড কার্যকর করলেই সমাজ থেকে অপ’রাধ দূর হয় তা বলা যায় না। ল’ঘু দ’ণ্ডও অনেক সময় সমাজ থেকে অপ’রাধ কমাতে সাহায্য করে।

বাবা-মা ও অভিভাবকদের সন্তানদের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সন্তানদের উপযুক্ত সময় দেওয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেন আ’দালত।

সূত্র: একুশে টেলিভিশন।