যে কারণে আজারবাইজানকে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নাগোর্নো-কারাবাখ সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানিয়েছে। দক্ষিণ ককেশাসের এই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দুটো দেশে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে এক সপ্তাহ ধরে তীব্র যুদ্ধ চলছে।

সবাই অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহবান জানালেও একমাত্র দেশ তুরস্ক এই সংঘাতে সরাসরি আজারবাইজানের পক্ষ নিয়েছে। নৈতিক সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি আঙ্কারা আজারবাইজানকে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে। ২৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার সকালে হঠাৎ করে যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যাওয়ার পর আজারবাইজানের পক্ষে সমর্থন জানাতে তুরস্ক একটুখানিও বিলম্ব করেনি। আঙ্কারা সাথে সাথেই ঘোষণা করে যে এই লড়াইয়ে তারা আজারবাইজানকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।

নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। এই অঞ্চলের মালিকানা কার- এই প্রশ্নে এই দুটো দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা ছাড়াও ওই অঞ্চলে মাঝে মধ্যেই উত্তেজনা তৈরির পাশাপাশি সামরিক সংঘর্ষও হয়েছে। এই বিরোধ মেটাতে মিনস্ক গ্রুপ নামে একটি মধ্যস্থতাকারী দল কয়েক বছর ধরে আলোচনা চালিয়ে আসছে যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বিষয়ক সংস্থা ওএসসিই।

এতো বছরের কূটনৈতিক চেষ্টা ও রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার পরেও এই সঙ্কটের কোন সমাধান হয়নি। তাই তারা মনে করে যে নাগোর্নো-কারাবাখ থেকে আর্মেনীয় বাহিনীকে হটিয়ে আজারবাইজান যদি ওই অঞ্চলটুকু দখল করে নেয় সেটাই হবে দীর্ঘদিন ধরে চলা সঙ্কটের একমাত্র সমাধান এবং এর পরেই সেখানে স্থিতি ও শান্তি ফিরে আসবে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনী নাগোর্নো-কারাবাখ দখল করে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে এই এলাকাটি আজারবাইজানের বলে স্বীকৃত, কিন্তু এটি পরিচালনা করে জাতিগত আর্মেনীয়রা।

এর মধ্যে নাগোর্নো-কারাবাখ নিজেদের স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকারও গঠন করেছে। কিন্তু আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া কেউই তা মেনে নেয় নি। এই এলাকাটিকে তারা তাদের নিজেদের দেশের অংশ বলে মনে করে। তার জের ধরেই সর্বশেষ এই যুদ্ধের সূত্রপাত। যাতে এখনও পর্যন্ত শতাধিক বেসামরিক নাগরিক এবং যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

ভৌগলিক কৌশলগত কারণে আজারবাইজান তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একারণে তুরস্ক বিভিন্ন সময়ে আজারবাইজানকে নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। নব্বই-এর দশকের শুরুর দিকে নাগোর্নো-কারাবাখকে কেন্দ্র করে আর্মেনিয়ার সাথে আজারবাইজানের যুদ্ধের সময় আজারবাইজানে অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছিল তুরস্ক। ২০১০ সালে দুটো দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তিতেও সই করেছে।

এবছরের জুলাই মাসেও আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে ছোটখাটো একটি যুদ্ধ হয়েছিল। এর পর থেকে তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। দুটো দেশ মিলে যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়েছে।

এবারের সংঘাত শুরু হওয়ার পর আজারবাইজানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন প্রকাশ করেছে তুরস্ক। তুর্কী প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, আজারবাইজানকে তারা সব ধরনের সহায়তা দেবেন। আর্মেনিয়াকে তিনি ওই অঞ্চলে শান্তির জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে সারা বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়েছেন, তার ভাষায়, “আর্মেনিয়ার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে” রুখে দাঁড়ানোর জন্য।

আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। দুটো দেশ নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে “এক জাতি, দুই দেশ” এই নীতিতে বিশ্বাসী। শুধু রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পর্যায়ে নয়, তুরস্ক ও আজারবাইজানের সাধারণ জনগণও তাদেরকে একই জাতি বলে মনে করে। যদিও তারা তাদের ইতিহাসে কখনো এক রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলো না, তারপরেও তুর্কী ও আজেরিরা বিশ্বাস করে যে তাদের উৎস এক এবং তারা একই রক্ত, ইতিহাস ও সংস্কৃতির উত্তরসূরি।

“তারা নিজেদের শুধু বন্ধু হিসেবে মনে করে না, তারা বিশ্বাস করে যে তারা একে অপরের ভাই বোন।” গত শতাব্দীর শুরুতে অটোমান সাম্রাজ্যের একেবারে শেষের দিকেও তাদের মধ্যে একই ধরনের সম্পর্ক ছিল। ১৯১৮ সালে আজারবাইজান আর্মেনিয়া ও রাশিয়ার দিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়লে বাকুকে রক্ষার জন্য অটোমান সাম্রাজ্য তাদের সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল। তারাই আজারবাইজানকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রথম স্বীকৃতিও দিয়েছিল।

সেসময় আজারবাইজান ও অটোমান শাসকদের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে উল্লেখ ছিল যে নতুন রাষ্ট্রটি যখনই হুমকির মুখে পড়বে তখনই তারা অটোমান সাম্রাজ্যের কাছে সামরিক সহযোগিতা চাইতে পারবে। তার পরপরই বাকুকে রক্ষার জন্য সেখানে অটোমান বাহিনী পাঠানো হয়েছিল।

পরে ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আজারবাইজানের পতন ঘটে। এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আজারবাইজান আবার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন এই দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে এবারও তুরস্ক বিলম্ব করেনি।

তার পর থেকে দুটো দেশের মধ্যে সম্পর্ক সবসময় একই রকমের উষ্ণ রয়ে গেছে। আর্মেনিয়ার সাথে সবশেষ সংঘাত শুরু হওয়ার পরেও তুরস্ক সাথে সাথেই বাকুর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

তুরস্কের সাথে আর্মেনিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই শত্রুতামূলক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান তুর্কী শাসকদের হাতে বহু আর্মেনীয় নিহত হয়। আর্মেনিয়া একে গণহত্যা বলে উল্লেখ করলেও তুরস্ক একে গণহত্যা বলে স্বীকার করতে রাজি নয়।

আর্মেনিয়ার দাবি যে অটোমান শাসকরা ১৯১৫ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে সুপরিকল্পিতভাবে ১৫ লাখ আর্মেনীয়কে হত্যা করেছে। বহু মানুষকে পাঠিয়েছে নির্বাসনে। অটোমান তুর্কী শাসকরা এই আর্মেনীয়দের সন্দেহ করতো। তারা মনে করতো খ্রিস্টান আর্মেনীয়রা অটোমান খেলাফতের প্রতি যতটা অনুগত, তার চেয়েও অনেক বেশি অনুগত ছিল খ্রিস্টান সরকারগুলোর প্রতি।

আর্মেনিয়া প্রতি বছরের ২৪শে এপ্রিল দিনটিকে গণহত্যার সূচনা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এই হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্যে দেশটি বহু আগে থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি তুরস্কের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং নিজেদের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে আর্মেনিয়ার কৌশল। কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি আজকের তুরস্ক দাবি করে সেটি ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গৃহযুদ্ধের ফল।

সূত্র: বিবিসি