‘ইসলাম সঙ্ক’টে‘- প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর এই বক্তব্যে তী’ব্র প্রতিক্রিয়া

ZAKARIA ABDELKAFI

ইসলাম এবং ফরাসী মুসলিমদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ শুক্রবার প্যারিসের কাছে অভিবাসী অধ্যুষিত একটি এলাকায় ঘন্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে তার এক ভাষণে যে ভাষায় কথা বলেছেন, যে শব্দ বা বিশেষণ ব্যবহার করেছেন – তার নজির ফ্রান্সে বিরল।তিনি বলেন, যে সব গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি ফ্রান্সের ঐক্য এবং ফরাসী প্রজাতন্ত্রের ‘ধর্মনি’রপেক্ষ মূল্যবোধকে‘ হুম’কিতে ফেলছে তাদের মোকাবেলার জন্য নতুন একটি আ’ইন তিনি আনছেন। ফরাসী সমাজের ঐ কথিত শত্রু হিসাবে তিনি পরিষ্কার করেই চিহ্নিত করেছেন ‘কট্টর ইসলাম‘কে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বলেন, ফ্রান্সের ঐক্যের প্রধান বন্ধনই হচ্ছে ‘ধর্মনিরপে’ক্ষতা।‘ “যারা ধর্মের নামে সেখানে ফাটল ধরাতে চায় তাদের বি’রুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে,“ তিনি বলেন। পুরো ভাষণ ধরে মি ম্যাক্রঁ বলার চেষ্টা করেন তিনি ইসলাম ধর্ম বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নন, কিন্তু একইসাথে ইসলাম ধর্ম নিয়ে গভীর শ’ঙ্কা প্রকাশ করেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট। “বিশ্বজুড়ে ইসলাম একটি সঙ্কটে পড়েছে, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও এই ধর্মটি স’ঙ্কটে।“

তিনি বলেন, “এই ধর্মটিকে এখন আমাদের সাহায্য করতে হবে যাতে তারা ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রের অংশীদার হতে পারে।“ তিনি বলেন, ফ্রান্সে এমন একটি ইসলাম প্রতিষ্টা করতে হবে যার ভিত্তি ‘জ্ঞানের আলো।’ এ প্রসঙ্গে তিনি ফ্রান্সে রাষ্ট্র থেকে গির্জাকে আলাদা করার ঐতিহাসিক আ’ন্দো’লনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

মুক্ত ইসলাম

ফরাসী রাজনীতিকদের মুখে ইসলামের সংস্কার, ফ্রান্সের রাজনৈ’তিক-সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় এমন ইসলামের কথা নতুন নয়। সাবেক ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজিও ‘ইসলাম পুনর্গঠনের‘ পরিকল্পনা করেছিলেন। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর কণ্ঠেও একই ধরনের সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, “ফরাসী প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা, এর মূল্যবোধ রক্ষা এবং সাম্য এবং মুক্তির জন্য প্রজাতন্ত্রের যে প্রতিশ্রুতি তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।“

ফরাসী প্রেসিডেন্ট বলেন, ফ্রান্সের ৬০ লাখ মুসলিমের একটি অংশ একটি বিকল্প সমান্তরাল সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে যা বিপ’জ্জনক । “সমস্যা হচ্ছে একটি (ধর্মীয়) মতবাদ নিয়ে যেটি দাবি করছে যে তাদের নিজস্ব আইন প্রজাতন্ত্রের আ’ইনের চেয়ে শ্রেয় …বিদেশি প্রভাব থেকে ফরাসী ইসলামকে রক্ষা করতে হবে।“

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক’ট্টর ইসলাম এবং ইসলামী সন্ত্রাস নিয়ে ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের নেতাদের মধ্যে উ’দ্বেগ, সমালোচনা শোনা যাচ্ছে, তবে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর মত মূল ধারার মধ্যপন্থী একজন রাজনীতিকের মুখ থেকে ইসলাম নিয়ে এমন কথাবার্তায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। ফ্রান্সের মুসলিম নেতারা তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ক্ষু’ব্ধ। তারা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ক্ষুদ্র রাজনৈ’তিক স্বার্থে মুসলিম বি’দ্বেষীদের সূরে গলা মিলিয়েছেন, এবং তার প্রস্তাবিত আইন ফরাসী মুসলিমদের মূলধারার সমাজ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করবে।

প্যারিস মসজিদের রেক্টর শামসেদ্দিন হাফিজ দৈনিক ল্য ম্যঁদ-এ এক উপ-সম্পাদকীয়তে প্রেসিডেন্টের পুরো বিবৃতি এবং তার প্রস্তাবিত আ’ইনকে ‘ছল-চাতুরি‘ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নি’র্বাচনের আগে ইমেজ বাড়াতে এ ধরণের জনপ্রিয় কথাবার্তার বদলে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার। তিনি বলেন, মি ম্যাক্রঁ যেসব পরিবর্তনের কথা বলছেন, তা “রাষ্ট্রের ক্ষমতার আওতায় পড়েনা।“

ফরাসী মুসলিম এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আমর লাসফার রয়টার্স বার্তা সংস্থার সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসলাম এবং মুসলিমদের নিয়ে মি ম্যাক্রঁ যেসব শব্দ এবং বিশেষণ ব্যবহার করেছেন তা আপ’ত্তিকর। “তিনি মানুষের সামনে একটি বি’পদ, ভীতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন যার সাথে আমি একমত নই। তিনি শুধুই কট্ট’রপন্থা বা জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলতে পারতেন। ‘ইসলামি জ’ঙ্গি’বাদ‘ শব্দটি ব্যবহার করে সমস্ত মুসলিমকে এক কাতারে ফেলে দেওয়া ঠিক হয়নি।“

লেখক গবেষক ব্রুনো ম্যাকায়েস টুইট করেছেন, “মি ম্যাক্রঁ ইসলাম সম্পর্কে তার মনোভাব চেপে রাখেননি। এখন শুধু কট্টর ইসলামই তার কাছে সমস্যা নয়, ইসলাম ধর্মই তার সমস্যা।“ ফরাসী মুসলিম মানবাধিকার কর্মী ইয়াসের লুয়াতি টুইট করেছেন, “মুসলিমরা এমনিতেই আ’ক্রমণের হুম’কিতে। এখন মি. ম্যাক্রঁ আরো আ’ক্র’মণের প্রতিশ্রুতি দিলেন। তার এক ঘণ্টার ভাষণে তিনি ধ’র্মনিরপেক্ষতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন এবং কট্টর ডানপন্থী এবং মুসলিম বিদ্বে’ষী বামপন্থীদের সুরে গান গেয়েছেন।“

প্রস্তাবিত আ’ইনে কী থাকছে

ক’ট্টর ইসলাম থেকে ফরাসী সমাজকে রক্ষায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ যে আই’ন আনার কথা ঘোষণা করেছেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ তার একটি খসড়া চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। তবে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য-বিবৃতি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে যে ইসলামি শিক্ষা, মাদ্রাসা, ইসলামি প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চাঁদা এবং ক’ট্টর ইসলামি ভাবধারা প্রসারের বিরু’দ্ধে ক’ঠোর নজরদারি এবং তা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে:

* সরকারি চাকরিতে আছেন এমন কারো মধ্যে কট্ট’র মতবাদে দীক্ষা নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেখা গেলে সরকার সেখানে সহজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

* খেলাধুলো, বিনোদন বা অন্য কোনো কর্মকা’ণ্ডের আড়ালে ধর্মীয় কট্ট’রবাদ ছড়ানোর কোনো চেষ্টায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কঠোর হবে।

* তিন বছর বয়স থেকে স্কুলে যাওয়া বাধ্যবাধকতা করা হবে এবং ঘরে লেখাপড়ার নিষিদ্ধ করা হবে। একটি ধারণা রয়েছে যে অনেক মুসলিম পরিবার মূল ধারার শিক্ষা এড়িয়ে বাচ্চাদের ঘরে বসে পড়ানোর নামে অনুমোদিত মাদ্রাসায় পাঠায়।-আরবি ভাষায় পরিচালিত স্কুলের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে।

* বিদেশ থেকে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাঁদা নেওয়ার ওপর কড়া নজরদারির ব্যবস্থা হবে, এবং ফরাসী রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো সামাজিক-ধ’র্মীয় প্রকল্প নিষি’দ্ধ হবে।

* বাইরের দেশ থেকে ইমাম আনা বন্ধ করে ফ্রান্সের ভেতরে ইমাম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একটি ইসলামি ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করবে সরকার যেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

কেন এখন এই বিত’র্কিত পদক্ষেপ

দেশের ভেতর ইসলামী জ’ঙ্গিবাদ নিয়ে ফ্রান্স বেশ কয়েকবছর ধরে স’ঙ্কটে রয়েছে। গত পাঁচ বছরে স’ন্ত্রা’সী হাম’লায় ফ্রান্সে ২৫০ জনের মত মারা গেছে। এই স’ন্ত্রা’স মোকাবেলায় ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে, এবং আগামী বছর স্থানীয় নি’র্বাচন এবং দু বছর পর সাধারণ নি’র্বাচনে বিষয়টি বড় ইস্যু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, অপ’রাধ এবং জ’ঙ্গি ইসলামের বিরু’দ্ধে তিনি ততটা শক্ত নন বলে যে অভিযোগ রয়েছে নি’র্বাচনের আগে তা খণ্ডনে তৎপর হয়েছেন মি. ম্যাক্রঁ। নতুন এক জনমত জরিপ বলে, কট্টর ইসলাম রুখতে প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত আ’ইনের প্রতি সিংহভাগ ফরাসীর সমর্থন রয়েছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে রয়টর্স বার্তা সংস্থা বলছে, সরকার এখন ক’ট্টর ইসলামী ভাবধারা প্রসারের বিভিন্ন আলামত নিয়ে সত্যিই উদ্বি’গ্ন।

একজন কর্মকর্তা বলেন,”ফ্রান্সে অনেক মুসলিম পুরুষরা এখন নারীদের সাথে হ্যান্ডশেক করতে চাইছে না। মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে সুইমিং পুলে নারী এবং পুরুষের জন্য আলাদা সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে এমনকি চার বছর বয়সী বাচ্চা মেয়েদের মাথাতেও হিজাব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনুমোদিত মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ছে।”

জানা গেছে, ক্যাফেটেরিয়া বা সুইমিং পুলে নারী-পুরুষকে পৃথক করাকে স্থানীয় কোনো মেয়র অনুমোদন দিলেও তা বাতিলের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হবে।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা

ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্সে মুসলিমদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা ৬০ লাখের মত যা সেদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। তাদের অধিকাংশই এসেছে আফ্রিকায় সাবেক ফরাসী সব উপনিবেশ থেকে। পর্যবেক্ষকরা বলেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের ফরাসী মুসলিমদের ভেতর তাদের ধ’র্মীয় পরিচিতি প্রকাশের ব্যাপারে আকা’ঙ্ক্ষা বেড়েছে যা নিয়ে ক’ট্টর ধ’র্মনিরপেক্ষ ফরাসী রাষ্ট্রের সাথে মুসলিমদের বিরো’ধ বাড়ছে।

সেইসাথে মুসলিমরা সবসময় বৈষ’ম্য, ব’র্ণবাদী দৃষ্টিভ’ঙ্গির অভিযোগ করেন। কয়েক প্রজন্ম ধরে ফ্রান্সের নাগরিক হলেও শিক্ষা, চাকরি-বাকরিতে তারা অনেক পিছিয়ে। ফরাসী ইন্সটিটিউট অব ডেমোগ্রাফিক স্টাডিজের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রথম প্রজন্মের আলজেরিয়ান অভিবাসীদের মধ্যে ১৫% বেকারত্ব ছিল। সেই সংখ্যা এখন আরো বেড়ে ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফলে, বৈষ’ম্য নিয়ে রাষ্ট্রের বিরু’দ্ধে ক্ষো’ভের কারণেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্সের মুসলিম সমাজের একটি বিরাট অংশের মধ্যে মধ্যে ধর্মীয় র’ক্ষণশীলতার প্রতি ঝোঁ’ক বাড়ছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।