চট্টগ্রামে বন্ধের পথে ১০ হাজার কেজি স্কুল

চিরতরে বন্ধের মুখে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় ১০ হাজার কেজি স্কুল। এর সঙ্গে জড়িত দেড় লাখেরও বেশি শিক্ষক এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে করোনার প্রভাব শুরু হওয়ায় গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। টানা ৮ মাস বন্ধ থাকায় কেজি স্কুলগুলো একদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন আদায় করতে পারছে না। অন্যদিকে, আয় না থাকায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না বলে দাবি স্কুল কর্তৃপক্ষের।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ জানান, গত ৮ মাস ধরে দেশের লক্ষাধিক কেজি স্কুলের শিক্ষক বেকার হয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ১০ হাজার কেজি স্কুলে দেড় লক্ষাধিক শিক্ষক রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই এখন বেকার সময় পার করছেন। এছাড়া, টানা ৮ মাস বন্ধ থাকায় কেজি স্কুলসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এখন নষ্ট হওয়ার পথে। এভাবে বন্ধ অবস্থায় চলতে থাকলে দেশের অধিকাংশ কেজি স্কুল বন্ধ হওয়ার আশংকা করছেন কেজি স্কুল নিয়ে গঠিত এসোসিয়েশনের নেতারা।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিকবার স্বারকলিপি দিয়েছেন। এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা আসেনি। আগামীকাল দেশের সব কেজি স্কুলের সংগঠনকে নিয়ে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদ এর ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন দাবি নিয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি আরো জানান, আমাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- ১ নভেম্বর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের সব কেজি স্কুল খুলে দিতে হবে। স্কুলের পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য মাসিক ছয় হাজার টাকা ভাতা এবং রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিনোদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে সিনেমা হল, সবকিছু এখন উন্মুক্ত। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকার সবকিছু খুলে দিচ্ছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেজি স্কুল খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডিআইএম জাহাঙ্গীর আলম।

ফাতেমা আক্তার। নগরীর ১৯ নং দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের মিয়াখান নগরের ট্যালেন্ট কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা। চলতি বছরের শুরুতেও স্কুল ও টিউশন মিলে এই শিক্ষিকার আয় ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। কিন্তু দেশের করোনার প্রভাব শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই সাথে বন্ধ হয়ে যায় ফাতেমা আক্তারের সব আয়ও।
কথা হলে দৈনিক পূর্বকোণকে তিনি জানান, দেশে করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর খুব আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ি। একসাথে স্কুল-টিউশন সব বন্ধ। সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা স্কুল বন্ধ থাকলেও বেতন পাচ্ছেন। আমাদের মত কেজি স্কুলের শিক্ষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। একদিকে আর্থিক সংকট অন্যদিকে বাসায় অলস সময় পার করতে হচ্ছে।

মো দিদারুল ইসলাম
চেয়ারম্যান

স্কুলে তালা দিয়ে বেঞ্চ বাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন ভবন মালিক

সানরাইজ গ্রামার স্কুলের পরিচালক ও বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান মো. দিদারুল ইসলাম বলেন, করোনার এই দুঃসময়ে কেজি স্কুলের শিক্ষকরা সবচেয়ে কঠিন সময় সময় পার করছেন। শিক্ষকরা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে কিছু চাইতে পারছেন না। এই দুঃসময়ের কথা লজ্জায় কাউকে বলতেও পারছেন না। একই অবস্থা স্কুল মালিক তথা উদ্যোক্তাদের। ভাড়া দিতে না পারার কারণে স্কুল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন ভবন মালিক। অনেক ভবন মালিক স্কুলে তালা মেরে টেবিল-বেঞ্চ বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে।

তিনি আরো জানান, একদিকে স্কুলের ভাড়ার চাপ, অন্যদিকে শিক্ষকদের বেতনের আকুতি। সবমিলে আমরাও খুব খারাপ সময় পার করছি। এই দুঃসময়ে আমাদের আবেদন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে সরকার যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার অনুমতি দেন। অন্যথায়, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেন।

ডিআইএম জাহাঙ্গীর আলম
সহ-সভাপতি

স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার অনুমতি দেয়ার দাবি

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডিআইএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, এখন তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকার সবকিছু খুলে দিচ্ছে। বিনোদন কেন্দ্র থেকে শুরু করে সিনেমা হল, সবকিছু এখন উন্মুক্ত। তাই কেজি স্কুলের শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন থাকবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে আমাদের স্কুল খোলার অনুমতি দেন। এতে একদিকে শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। আর অন্যদিকে শিক্ষক ও স্কুল মালিকরাও বাঁচবে।

ডিআইএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, আল্লামা ইকবাল একাডেমি ও আলহাজ সোলায়মান সওদাগর কিন্ডারগার্টেনসহ মোট ৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে আমার। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সবাই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোন আয় না থাকায় তাদের বেতন প্রদান করতে পারছি না। সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাদের কোন সাহায্য বা প্রণোদনা না দেয় তাহলে স্কুল বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।

এ কে এম নুরুল বশর ভুইয়া
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

স্কুল চিরতরে বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় নেই

নগরীর রাহাত্তারপুল এলাকার ডন ভিউ কেজি এন্ড হাই স্কুলের পরিচালক ও বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন এসোসিয়েশন এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম নুরুল বশর ভুঁইয়া বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও সরকার প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছেন। কিন্তু কেজি স্কুলের শিক্ষকরা সে সুবিধা পাচ্ছে না। কেজি স্কুলগুলো ৫০ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সাথে জড়িত। কিন্তু কেজি স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষক বেকার হয়ে পড়েছে। আবার অনেকে শিক্ষক পেশা পরিবর্তন করেছেন। কিন্ত তারা সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য পাচ্ছেন না।

তিনি আরো জানান, প্রতিমাসে স্কুল ভাড়ার জন্য মালিক পক্ষ চাপ দিচ্ছেন। অনেকে চাপ সইতে না পেরে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, স্কুল বন্ধ থাকায় আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন বেতন আদায় করতে পারছি না। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, সরকার যেন কেজি স্কুলগুলোকে প্রণোদনা প্রদান করেন। অন্যথায় এসব স্কুল বন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।

সূত্র: পূর্বকোণ।